বাংলাদেশ ক্রিকেট

ক্রিকেটের বাহিরে যেমন কেটেছে সাকিবের সুদীর্ঘ ১ বছর

গত বছরের ২৯ অক্টোবরে ১ বছরের স্থগিতাদেশসহ ২ বছরের নিষেধাজ্ঞায় পড়েন সাকিব আল হাসান। এরপর আর মাত্র ৫ মাসই সক্রিয় ছিল ক্রিকেট খেলা। করোনা ভাইরাসের কারণে ক্রিকেট বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়লে খুব বেশি ম্যাচ মিস করতে হয়নি সাকিবের, সেটা তার জন্য যতটা সুখকর বাংলাদেশের জন্যও ততটাই।

সাকিবকে ছাড়া বাংলাদেশ দলকে কল্পনা করাটাও কঠিন, তবে অনেক সময় যত কঠিনই হোক মেনে নিতে হয়। গত ১ বছরে ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম (এফটিপি) অনুযায়ী বাংলাদেশের ম্যাচ ছিল মোট ২৯ টি, এর বাহিরে এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে স্থগিত হয়েছে এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, সাকিব মিস করেছেন তিন ফর্মেট মিলিয়ে ১৪ টি ম্যাচ।

অক্টোবর মাসটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ছিল শঙ্কা জাগানিয়া, প্রথমে ক্রিকেটারদের আন্দোলন। এরপর সেটা শেষ হতে না হতেই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন সাকিব আল হাসান, যেট এদেশের ক্রিকেটে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে। বদলে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের চিত্রপট, ভুল স্বীকার করে সাকিবও সবকিছু থেকে গুটিয়ে নেন। যে সাকিবের মাঠে পা না রাখলে পেটের ভাত হজম হওয়ার কথা নয়, তিনিই মাঠ থেকে দূরে সরে যান।

নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পর কিছুদিন ঢাকাতেই ছিলেন সাকিব আল হাসান। এরপর সবার অন্তরালেই পরিবারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। যদিও সেই যাওয়া নিয়ে খবর প্রকাশ হতে মোটেও সময় লাগেনি, তবে অদৃষ্টের লিখন হিসেবে সাকিবের মতো বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ভক্ত-সমর্থকদেরও মেনে নিতে হয়েছে। সেখানে প্রথম কয়েক মাস চুপচাপই ছিলেন, সেটা ক্রিকেটের পাশাপাশি দূরুত্ব ছিল সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকেও; এমন কি সাকিবের কাছের মানুষদের কাছ থেকেও মিলেনি কোন সংবাদ।

এরপরই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও আক্রান্ত হয় বৈশ্বিক মহামারি করোনা প্রাদুর্ভাবে, তখনই আবারও দৃশ্যপটে উপস্থিত হন সাকিব আল হাসান। ‘দ্যা সাকিব আল ফাউন্ডেশন’ চালু করে কঠিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান, এর বাহিরে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধাদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হন সাকিব আল হাসান। সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো অব্যাহত ছিল বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের সময়েও, মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজের নিজের প্রিয় জিনিস গুলোও নিলামে তুলতে দুইবার ভাবেননি।

নিষেধাজ্ঞার সময়েই দ্বিতীয় বারের মতো বাবা হয়েছেন সাকিব, আলাইনা হাসানের পর তার ঘর আলো করে আসে ইরাম আল হাসান। ক্রিকেটের বাহিরে থাকা এই সময়ের অধিকাংশটাই পরিবারের সাথে কাটিয়েছেন তিনি, এরপর ক্রিকেটে ফেরার অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডে ব্যক্তিগত অনুশীলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন সাকিব। কিন্তু অজানা কারণে সেটা স্থগিত হয়ে যায়, শ্রীলঙ্কা সফর দিয়ে ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ তৈরি হলে চলে আসেন দেশে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিকেএসপিতে সাকিব আল হাসান

গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে দেশে ফিরে বিকেএসপিতে শুরু করেন কঠোর অনুশীলন, যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন দুই গুরু মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন ও নাজমুল আবেদীন ফাহিম। প্রিয় ছাত্রের প্রয়োজনের সময় সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে গেছে বিকেএসপি। সেখানে প্রায় ১ মাস ফিটনেস ও স্কিল নিয়ে কাজ করার পর শ্রীলঙ্কা সফর স্থগিত হয়ে গেলে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান সাকিব আল হাসান। এখন পর্যন্ত সেখানেই পরিবারের সাথে আছেন তিনি, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই দেশে ফিরে টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে খেলবেন সাকিব।

আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় থাকলেও পুরোটা সময় বিজ্ঞাপনের হটকেক ছিলেন সুপারস্টার সাকিব আল হাসান, একদম শেষ দিকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে মূলধন বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি সংগঠন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি টিভিসি দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। শ্যুটিং এর পরপরই মুহুর্তের মধ্যে ভাইরাল হয় ব্যবসায়ী সাজে সাকিবের ছবি, যা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ক্রিকেটের বাহিরে থাকা যে কোন ক্রিকেটারের জন্যই কষ্টের, তবে নিষেধাজ্ঞার এই সময়টা সাকিবের একেবারেই খারাপ কেটেছে বলার উপায় নেই। বিশেষ করে দেশের ক্রান্তিলগ্নে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং একান্ত ভাবে দীর্ঘ সময় পরিবারের সাথে কাটানোর সুযোগ সব সময় ক্রিকেটারদের হয়ে ওঠে না। ব্যস্ত ক্রিকেটার সাকিবের জন্য তো বিষয়টা আরও কঠিন।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের কালো অধ্যায় পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাক দলের সবচেয়ে বড় তারকা সেটাই কামনা থাকবে কোটি ভক্ত-সমর্থকদের মনে। দীর্ঘদিন মাঠের বাহিরে থাকায় সাকিবও মুখিয়ে থাকবেন নিজেকে উজার করে দিতে, কঠিন সময়ে ভক্ত-সমর্থকদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চাইবেন নিজের জাদুকরী পারফর্মেন্স দিয়েই।

To Top