ফিচার

হে রাজা! আপন রাজ্যে আপনাকে সু-স্বাগতম

রাত তখন তিনটে বেজে কয়েক মিনিট। আকাশটা মায়াবী চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় বেশ মোহনীয়। শীতের আগমনী বার্তায় হিমহিম খানিকটা ঠান্ডা তাই দেহে অনুভূত হচ্ছে। সামান্য সময় চাঁদ-আলো গায়ে মেখে কাঁথা মুড়ি দিয়ে তাই শুয়ে আছি বিছানা বুকে। হঠাৎই কি মনে করে ফোনটা হাতে নিয়েই হতবিহ্বল হয়ে যাই মুহুর্তক্ষণে! দৈনিক সমকাল এটা কি ছেপেছে? কি লিখেছেন এসব আলী সেকান্দার?

মনটা আঁতকে উঠল। ধোঁয়া যখন উঠেছে, আগুন তো কোথাও লেগেছে… ঘটনার পুরোটা বুঝতে না পারলেও, জানতে পেরেছি খানিকটা হলেও সত্যতা আছে তাঁর। রাতটাও ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে, পূর্বাকাশে প্রভাতের আভা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু আমি নির্ঘূম-নিদ্রাহীন, এমন উদ্বেগ বুকে কি ঘুমানো যায়? সকাল হতে হতে পুরো নিউজফিডটা ভরপুর দৈনিক সমকালের টুকরো একখানা ছবিতে… যাতে মোটা কালিতে লিখা — “১৮ মাস নিষিদ্ধ হচ্ছেন সাকিব„
জুয়াড়িদের প্রস্তাব গোপন রাখার অভিযোগ আইসিসিতে প্রমাণিত!”

বাংলার সর্বশেষ নবাব বেঁচে থাকলে হয়তো আজ আবারও বলতেন পলাশী চত্বরের সেই ইতিহাস জড়ানো বাণীখান। অশ্রুস্নাত কন্ঠে হয়তো প্রতিধ্বনিত হতো আবারও সেই অসহায়ত্ব সুর… “বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে। এমন কেউ কি আছে, যে বলবে আশা নয় দূর আশা।”

যাহোক, ভঙ্গ হৃদে, উদ্বেগ বুকে আপন মহিমায় বেলার বিদায়ে, আগমন হয় বিষন্ন কালো সন্ধ্যার। দিনটা শুধুই বিষন্ন ছিলনা, ছিল টান টান উত্তেজনা ম্লাত। পলকহীন চোখে সবে তাকিয়ে ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন দেখা সেই জোড়ো চোখ পানে। যদি একবার ওই দুটো চোখ ভিন্ন কিছুর বার্তা দিতো, বলতো এই সবই ষড়যন্ত্রের অংশ… কি হতো বাংলার বুকে, বলা লাগবে কি আরও?

আপোষহীন বাঙালী সম্প্রদায় চিরকাল রক্তগরম। অধিকার আদায়ে কিংবা ভালোবাসার প্রমাণ রাখতে রাজপথ কাঁপাতে, প্রয়োজনে রক্ত ঢালতেও দ্বিধা রাখে না ওরা বুকে। সেদিনও বার বার সাকিব ঘনিষ্ঠ জন হতে নিষেধ করা সত্ত্বেও গর্জে উঠেছিল ওরা, গরম হয়ে উঠেছিল মিরপুরের আবহাওয়া। স্লোগানে স্লোগানে, সাকিব সমর্থনে উত্তাল চারিপাশ; খবরটা যে মানতে পারছেন কোন মন, করছে হাঁসফাঁস।

আকাশে চাঁদ আছে, তারকারাজিও আপন মনে খেলা করছে…কিন্তু তবুও কেন যেন সেই সন্ধ্যাটা একটু বেশীই অন্ধকার। মুদি দোকান সম্মুখ চত্বর আজ লোকারণ্য, গ্রামের হাট বাজারে ভিড়। ব্যস্ত নগরী থমকে আছে অজানা এক শঙ্কায়। কি হবে হায়? যে যেখানেই আছে, উদ্বিগ্ন মনে, ভঙ্গ হৃদে তাকিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদ মিডিয়ায়। খানিক আগে যে খবর এসেছে স্বয়ং সাকিব কথা বলবেন মিডিয়া সম্মুখে।

সময় বহমান, হারায় প্রতি ক্ষণ। কিন্তু ফুরোয় না অপেক্ষার প্রহর। কখন আসবেন সাকিব? বলবেন সব কিছুই মিথ্যে… যা হোক, অবশেষে অবসান হলো তার। সাকিব আসলেন মিরপুরে, চলে গেলেন বিসিবির কার্যালয়ে। আর যখন ফিরলেন…কি বলবো আর, সাকিবের ওই ফোলা-ফাপা অশ্রুসিক্ত চোখ কে কবে আর কখন দেখেছে আর। বুঝাই যাচ্ছিলো ভেতরের অশ্রুস্রোত দমিয়ে রাখতে মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত-ভার তিনি।

কথা বলতে শুরু করলেন তিনি। তাঁর বলা বক্তব্যে খানিকটা আশাহত হলেও কেউ বিশ্বাস হারায়নি। তাঁর অশ্রুস্নাত সেই চোখ পানে তাকিয়ে তখন প্রবল সমালোচকও তখন কেঁদে ফেলতে বাধ্য। সেই মুহুর্তে দেখা প্রতিটি চোখও যেন তাই বলছে। পেশাদারীত্বের উর্দ্ধে গিয়ে কেঁদে ফেললেন অনেক সংবাদকর্মীও। যাহোক, ভুলটা স্বীকার করলেন, স্বীকার করলেন স্বীয় দায়িত্বশীলতা। শাস্তিটাও নিলেন মাথা পেতে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে সাকিবকে অবলোকন করা প্রতিটি চোখ যেমন তাঁর অশ্রুস্নাত ফোলা-ফাঁপা চোখ জোড়া দেখেছে, দেখেছে তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ অন্তর। খালি চোখে দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো কি চলছিলো তখন সাকিব স্পন্দনে। বুঝাই যাচ্ছিলো তাঁর হৃদয় তখন পাঠ করছিলো এক শপথ বাক্য… বলছিলো আমি ফিরবো, আমাকে ফিরতেই হবে। ফিরতে হবে লাল-সবুজের এই দেশটার জন্য, এদেশের মানুষের জন্য। আবারো গাইবো গান, ফিরিয়ে দেবো স্বপ্ন প্রতি চোখে।

অতঃপর ছুটলেন গাড়ির দিকে। অন্য সময় হলে হয়তো সংবাদকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরতেন, একটা কথা শুনার জন্য ছুটে যেতেন। কিন্তু সেদিন তাঁরাই বের হবার পথটা করে দিলেন, ক’জন অবশ্য কিছু একটা বললেও বাকীরা তখনও নিস্তব্ধ, নির্বাক! নিরবতা ভাঙলেন সাকিবই, ভেজা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো শুধুই “পাপন ভাই আমি গেলাম।” সেই যে গেলেন… অতঃপর ফিরলেন আজ বছরটা পেরিয়ে, স্বীয় মন্দিরে।

হয়তো মাঠে ছিলেন না, গড়তে পারেননি নতুন কীর্তিগাঁথা। ভাগ্য বিপাকে রাজত্ব ছেড়েছেন, হারিয়েছেন সিংহাসন, সাথে বিশ্বসেরার রাজ মুকুটটাও। কিন্তু আছেন ১৬ কোটি মানুষের প্রাণে-হৃদে-স্পন্দনে। প্রতিটি দিন গননা করে প্রতিক্ষণে তাঁর অপেক্ষায় থেকেছে সাকিব প্রিয় প্রাণেরা। ছবিতে, গল্পতে, লিখনিতে যে যখন যেভাবে পেরেছে ফুঁটিয়ে তুলেছে তার ভালোবাসা; কেউ বা  আবার লিখেছে কাব্য-কথা। তবে দিনশেষে অনুভবে তুমিহীন শূন্যতা!

শূন্যতা তবুও খানিকটা থামিয়েছে করোনার থাবা। যদি বলি সাকিবহীন বাইশগজ প্রভু দেখতে চায়নি, তবে তা হবে রসিকতা, মূর্খতা আর বাড়াবাড়িও বটে। বিধাতা কখন কি চান, তা শুধুই তাঁর একান্ত নিয়ন্ত্রণে। তা যা হোক, সাকিব ফিরেছেন আজ দুঃখ ঘুচিয়ে, আলোর দিশা নিয়ে। নিশ্চয়ই দৈনিক সমকাল নিউজ করবে তার ফেরা নিয়ে, আলী সেকান্দার কলাম লিখবে রাজার প্রত্যাবর্তন নিয়ে। যেই লেখার সারমর্ম হবে—

“হে রাজা! আপনার রাজ্যে আপনাকে সু-স্বাগতম। এই রাজত্ব শুধুই আপনার। আপনার তরেই রাজ সিংহাসন শোভা পায়, আপনার শিরেই রাজ মুকুট তার পূর্ণ সৌন্দর্যতা ফিরে পায়!”

To Top