বাংলাদেশ ক্রিকেট

বিশ্লেষণ | এই ১১ জনই কেন বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপের সেরা?

টুর্নামেন্টের পর্দা নেমেছে গতকালই, নাজমুল একাদশের বিপক্ষে ৭ উইকেটের বড় জয় তুলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মাহমুদউল্লাহ একাদশ। যে কোন টুর্নামেন্ট শেষের পরেই সবার আগ্রহ থাকে টুর্নামেন্টের সেরা একাদশটা কেমন হতে পারে, কে কোন পজিশনে সেরা ছিল।

ডেইলি স্পোর্টস বিডিও বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপের সেরা একাদশ বের করার চেষ্টা করেছে, সেই সাথে কেন তারা একাদশে সুযোগ পাবেন তার কারণ ও তাদের পারফর্মেন্স বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

  • বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপের সেরা একাদশঃ

১৷ লিটন দাস

টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের জন্য দুঃস্বপ্নের একটা নাম ছিল বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ টুর্নামেন্ট, পুরো টুর্নামেন্টে ওপেনিং পার্টনারশিপ একবারও ৫০ স্পর্শ করতে পারেনি। সর্বোচ্চ ২৭ রানের জুটি এসেছে সাইফ হাসান ও সৌম্য সরকারের ব্যাট থেকে, ৫ ম্যাচে মাত্র ২ জন ওপেনার ফিফটির দেখা পেয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম ফাইনালে ৬৮ রান করা লিটন দাস, টুর্নামেন্টের সেরা একাদশে আমাদের এক নাম্বার ওপেনারও তিনিই।

পুরো টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচ খেলে ২২.২০ গড়ে ও ৯৩.২৭ স্ট্রাইকরেটে ১১১ রান করা করেছেন লিটন দাস, সর্বোচ্চ ৬৮ রান। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে অন্তত ১০০ রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্ট্রাইকরেটও লিটন দাসের, চার মেরেছেন ১৮ টি।

২৷ তামিম ইকবাল

বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল, তাই তার প্রতি সবার আলাদা একটা প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তিনি সেটা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটা অধিনায়ক হিসেবে যতটা ব্যাট হাতেও ঠিক ততটাই। ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হওয়ায় ম্যাচ খেলেছেন ৪ টি যেখানে ২৫.২৫ গড়ে ও ৬৬.৮৮ স্ট্রাইকরেটে করেছেন ১০১ রান, সর্বোচ্চ ৫৭ রানের ইনিংস আছে তামিমের।

তবুও টুর্নামেন্টে ওপেনারদের ব্যর্থতায় আমাদের দ্বিতীয় সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল, নাজমুল একাদশের বিপক্ষে মাহিদুল ইসলামকে সাথে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৬৮ রানের জুটি গড়েন তামিম।

৩৷ ইমরুল কায়েস

টুর্নামেন্টে শুরুটা ভালো করতে না পারলেও সময়ের সাথে নিজেকে মেলে ধরেছেন পরিক্ষিত ব্যাটসম্যান ইমরুল কায়েস, যদিও আহামরি কিছু করতে পারেননি তিনি। তবে সেটাই একাদশে থাকার জন্য যথেষ্ট হয়েছে টপ অর্ডারে সেভাবে কেউ ভালো করতে না পারায়, ফাইনালে খেলেছেন গুরুত্বপূর্ণ ৫৩ রানের অপরাজিত ইনিংস; স্ট্রাইকরেটও অন্যদের চেয়ে বেশ স্বাস্থ্যবান।

টুর্নামেন্টে সব গুলো ম্যাচেই খেলেছেন ইমরুল কায়েস, ৫ ম্যাচে ৩৬.৫০ গড়ে করেছেন ১৪৬ রান৷ স্ট্রাইকরেট ৮৩.৯০, সেরা ইনিংস অপরাজিত ৫৩ রান। আছে ৪৯ রানের আরেকটি ইনিংসও, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৭ টি ছক্কাও এসেছে ইমরুল কায়েসের ব্যাট থেকে।

৪৷ মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক)

টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক মুশফিকুর রহিম, টুর্নামেন্টে যৌথ ভাবে সর্বোচ্চ ২ ফিফটির সাথে একমাত্র সেঞ্চুরিও এসেছে তার ব্যাট থেকেই। স্বীকৃতি স্বরূপ টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারটাও জিতেছেন মুশফিক, উইকেটের পেছনেও বেশ একটিভ ছিলেন; নিয়েছেন ৪ টি ক্যাচ। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপের সেরা একাদশের গ্লভসও থাকবে মুশফিকুর রহিমের কাছেই।

ফাইনালে ব্যর্থ হলেও টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে ৪৩.৮০ গড়ে ২১৮ রান করেছেন মুশফিকুর রহিম, দুই ফিফটির বিপরীতে সেঞ্চুরি একটি। সর্বোচ্চ ১০৩ রান মাহমুদউল্লাহ একাদশের বিপক্ষে, স্ট্রাইকরেট ৬৮.০১।

৫৷ আফিফ হোসেন ধ্রুব

এই টুর্নামেন্টকে তরুণদের জন্য নিজেকে প্রমাণের মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিলো, দুর্দান্ত কিছু না করতে পারলেও ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার মধ্যেও যে ক’জন তরুণ নিজেদের জাত চিনিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম আফিফ হোসেন ধ্রুব। মাহমুদউল্লাহ একাদশের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিমের সাথে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১৪৭ রানের জুটিও এসেছে আফিফের ব্যাট থেকেই, সেদিন রান আউটে কাটা না পড়লে পেয়ে যেতেন সেঞ্চুরিও।

নিজেকে দুর্ভাগা ভাবতেই পারেন আফিফ হোসেন, মাহমুদউল্লাহ একাদশের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলতে থাকা এই ব্যাটসম্যান ৯৮ রানে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়ে বঞ্চিত হন সেঞ্চুরির। অন্য দিকে পুরো টুর্নামেন্টে ভালো খেলেও ফাইনালে দলের জন্য কিছুই করতে পারেননি তিনি।।বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে ৫ ম্যাচ খেলে ৩১.৪০ গড়ে করেছেন ১৫৭ রান, সর্বোচ্চ ৯৮ রান।

৬৷ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (অধিনায়ক)

দলের বিপদ মুহুর্তে সব সময়ই কাণ্ডারির ভূমিকায় দেখা যায় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে, বাংলাদেশ দলকে অনেক বিপদ থেকে টেনে তুলেছেন তিনি। যার ফলে রিয়াদকে সাইলেন্ট কিলারও বলা হয়ে থাকে, এবারের বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপেও একই ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে এনে দিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন ট্রফিও, টুর্নামেন্টে ৩ অধিনায়কের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রিয়াদই।

বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে মাত্র ৩ জন ব্যাটসম্যান ২ টি করে ফিফটি পেয়েছেন, যার মধ্যে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও একজন। টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচ খেলে ৪০.৫০ গড়ে করেছেন টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৬২ রান, স্ট্রাইকরেট ৭০.৭৪। এছাড়াও অফ-স্পিনে পেয়েছেন ২ উইকেটও।

৭৷ ইরফান শুক্কুর

বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে সবচেয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন নাজমুল একাদশের ইরফান শুক্কুর, লাইম-লাইটের বাহিরে থাকা এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান ভিন্ন পজিশনেও দুর্দান্ত পারফর্মেন্স দেখিয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা দিয়েছেন ব্যাট হাতে, প্রয়োজনে ইনিংস গড়েছেন আবার দলের প্রয়োজনেই বিধ্বংসী মেজাজও দেখিয়েছেন। টুর্নামেন্ট ও ফাইনালের সেরা ব্যাটসম্যানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন ইরফান শুক্কুর, টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানও এসেছে তার ব্যাট থেকেই।

ফাইনালে ৭৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলা ইরফান শুক্কুর টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচ খেলে ৭১.৩৩ গড়ে করেছেন ২১৪ রান, স্ট্রাইকরেট ৮৮.০২; ২ টি ফিফটির পাশাপাশি আছে ৪৮ রানের অপরাজিত ইনিংসও।

৮৷ মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে দেখা মিলেনি দুর্দান্ত কোন অলরাউন্ড পারফর্মেন্সের, প্রত্যাশাটা অবশ্য ছিল মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনকেই ঘিরেই। বল হাতে সেই প্রত্যাশা দুর্দান্ত ভাবে মেটাতে পারলেও ব্যাট হাতে ব্যর্থ ছিলেন পেস বোলিং এই অলরাউন্ডার, ব্যাট হাতে সুযোগ ছিল দলকে ফাইনালে তোলার কিন্তু তিনি সেটা পারেননি। তবুও বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ৫০ রান ও ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব সাইফুদ্দিনেরই।

বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে ফাইনালে উঠতে না পারায় খেলেছেন ৪ টি ম্যাচ, অবশ্য তাতেই টুর্নামেন্টে রুবেল হোসেনের সাথে যৌথ ভাবে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক হয়েছেন মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন। ৪ ম্যাচে ৩৩.১০ গড়ে ১২ উইকেট পেয়েছেন তিনি, ইকোনমি ৩.৯৭। টুর্নামেন্টের সেরা বোলিং ফিগারও (৫/১৮) তারই, এর বাহিরে ব্যাট হাতে করেছেন ৬৩ রান।

৯৷ রুবেল হোসেন

মাহমুদউল্লাহ একাদশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন রুবেল হোসেনই, প্রতিটা ম্যাচেই বোলিংয়ে দলকে দুর্দান্ত শুরু এনে দিয়েছেন। হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা বোলারও, মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের সাথে যৌথ ভাবে ১২ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকও রুবেল হোসেন। ফাইনালেও পেয়েছেন ২ উইকেট।

বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে ৫ ম্যাচ খেলেছেন রুবেল হোসেন, যেখানে ১৩.৪১ গড়ে নিয়েছেন ১২ উইকেট। ইকোনমি ৪.০২, সেরা বোলিং তামিম একাদশের বিপক্ষে ৩৪ রান দিয়ে ৪ উইকেট।

১০৷ নাসুম আহমেদ

বাংলাদেশ বরাবরই স্পিন সমৃদ্ধ একটা দল, ঘরোয়া যে কোন টুর্নামেন্টেই সেরা বোলিংয়ের তালিকায় থাকে স্পিনারদের আধিপত্য। কিন্তু এবারের বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপকে ব্যতিক্রমই বলা যায়, সাকিবের অনুপস্থিতি আর গত কয়েক বছর ধরে সেভাবে স্পিনার উঠে ও কন্ডিশনও এর পেছনের একটা কারণ হতে পারে।

তবে পেসারদের দাপটের মধ্যে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করেছেন নাসুম আহমেদ, টুর্নামেন্টে মাত্র ৩ ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া বাঁহাতি স্পিনে ১৬.৩৩ গড়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট। ইকোনমিও ছিল ঈর্ষণীয়, ৩.৭৪, সেরা বোলিং ২৩ রান দিয়ে ৩ উইকেট।

১১৷ মুস্তাফিজুর রহমান

একাদশের একমাত্র বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান, দল ফাইনালে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় অন্যদের চেয়ে ১ ম্যাচ কম খেলেছেন তিনি। মুস্তাফিজুরের চেয়েও অনেকের পারফর্মেন্স ভালো, কিন্তু দলে প্রভাব রাখতে পারা এবং বৈচিত্র্য রাখতে মুস্তাফিজকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।

বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে ৪ ম্যাচ খেলা মুস্তাফিজুর রহমান ১৪.৭৫ গড়ে পেয়েছেন ৮ উইকেট, পেসারদের মধ্যে অন্তত ১০ ওভার বোলিং করেছেন এমন বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ইকোনমিও (৩.৫৭) তারই। সেরা বোলিং ১৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট।

১২৷ তাসকিন আহমেদ

ইঞ্জুরি কাটিয়ে বছরের শুরুতে বিসিএলে দারুণ পারফর্মেন্স দেখিয়েছেন তাসকিন আহমেদ, নিজেকে ফিরে পাওয়ার আভাস দিয়ে ২ ম্যাচ খেলে নেন ১০ উইকেট। কিন্তু করোনা বিরতির পর তাসকিন সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন কি-না সেটাতেই চোখ ছিল সমর্থক থেকে শুরু করে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবারই, সেই পরিক্ষায় বেশ ভালোভাবেই উতরে গেছেন তিনি।

করোনা বিরতির সময় ফিটনেস নিয়ে অনেক কাজ করেছেন তাসকিন আহমেদ, যার ফলাফলও পেয়েছেন বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে। ফাইনালে ভালো কিছু করতে না পারলেও পুরো টুর্নামেন্টেই বল হাতে ছন্দে ছিলেন তাসকিন আহমেদ, ৫ ম্যাচ খেলে ২৬.২৮ গড়ে পেয়েছেন ৭ উইকেট। পেয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা কামব্যাক প্লেয়ারের পুরস্কারও।

[নোট] – বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে পেসারদের পারফর্মেন্স ছিলো খুবই দুর্দান্ত, টুর্নামেন্টের সেরা ৫ জন বোলারই পেসার। এমন কি সেরা ৭ এ নেই কোন স্পিনার। যার ফলে একাদশের জন্য সেরা ৩ পেসার বেছে নেওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার, একাদশের জন্য পেসার বেছে নেওয়ার পেছনে তাদের পারফর্মেন্স ও দলে প্রভাব রাখার সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ফাইনালের সেরা ক্রিকেটার হওয়া সুমন খানকে একাদশে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি, যদিও টুর্নামেন্টে তার যা পারফর্মেন্স তাতে তিনিও একাদশে জায়গা দাবী করেন।

 

To Top