fbpx

গল্পটা রক্তঝরা ভাঙা চোয়ালের, গল্পটা বীর কুম্বলের

কখনও কারও কারও জন্য বাইশগজটা হয়ে দাড়াঁয় জীবনের চেয়ে বড় কিছু। রক্ত ঝরছে, ব্যান্ডেজ বাঁধা, সাথে তীব্র যন্ত্রণা, অধিনায়কের বারণ, সতীর্থদের উদ্বেগ, সমর্থকরা বিহ্বল __তবুও বাইশগজ ছেড়ে শুশ্রূষা নিতে অপারগ তারা। উদাহরণ অসংখ্য আছে, বাংলার অধিনায়ক মাশরাফীর কথাও ভাসে; আসে এশিয়া কাপে ভাঙা হাতে মাঠে নেমে তামিম ইকবালের এক হাতে ব্যাটিং বীরত্বগাঁথাও। বলতে হয় গ্রায়েম স্মিথ, কারেস্টেনের কথাও। ম্যালকম মার্শাল তো জ্বলন্ত ইতিহাস। তাদের ভিড়ে জ্বলজ্বল করছে আরও একটি নাম; নামটা অনিল কুম্বলে।

অনিল কুম্বলে নামটা শুনা মাত্রই স্মরণে আসে, চোখে ভাসে, দেহে শিহরণ জাগে এক দর্পদীপ্ত বিস্ময়কর কীর্তির আঙ্গিকে। কি তা মনে আছে কি? সময়টা ৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯। ভারতের মাটিতে টেস্ট সিরিজ হচ্ছে; প্রতিপক্ষ পাকিস্তান! প্রত্যাশা, চাপ, টেনশন— সমস্ত কিছুরই ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম হয় যাদের লড়াইয়ে। আর ইতিহাস তো এমনি সৃষ্টি হয় এমনি আবহে! গোঁফওলা, শ্যামলা রঙের লম্বাটে লেগ স্পিনার কুম্বলে সেবার স্বীয় হাতের ঘূর্ণিতে সৃষ্ট করলেন সেই কীর্তিময় হিমশীতল মুহূর্ত। একটি ইনিংসের দশটা উইকেটের প্রতিটাই শিকার তার একাই; “দশের দশ”–ই এক হাতে।

গোটা বিশ্ব অবাক দৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে উপভোগ করলো এই দৃশ্য। দেখলো কুম্বলে ভেল্কি। সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান সাইদ আনোয়ার, ইনজামাম উল হক, শহীদ আফ্রিদি, মোহাম্মদ ইউসুফ কে ছিলেন না সেই দলে? হারভজন, প্রাসাদ, শ্রীনাথ সবাই যখন দাঁতে দাঁত চাপে, কুম্বলে তখন ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে স্বীয় নামটা লিখলেন স্বীয় হাতে। —যাহোক ফিরি আগের ইস্যুতে, পেছনের গল্পেতে। জীবনের উর্দ্ধে ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিয়ে কি করেছিলেন কুম্বলে সেক্ষণে…. ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সালে।

__বলটা প্যাডে লাগতেই জোরালো আপিল। ডেভিড শেফার্ড তর্জনী তুলে দিলেন। এক মুহূর্ত নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে ড্রেসিংরুমে হাঁটা দিলেন ব্রায়ান লারা। অনিল কুম্বলেকে ঘিরে তখন সতীর্থদের উল্লাস। মুহূর্তটা আলাদাভাবে জায়গা করে নিল ক্রিকেটের চিরকালীন অ্যালবামে। টেস্ট ক্রিকেটে ৬১৯টি উইকেট আছে তাঁর। ১৫৬টিই এলবিডব্লিউ এর ফাঁদে ফেলে। কিন্তু অ্যান্টিগা টেস্টে কুম্বলের নেয়া ব্রায়ান লারার এই উইকেটটির সঙ্গে অন্যগুলোকে মেলানো যাবে না যে; এটা যে এক ভিন্নতর ইতিহাস! কিভাবে, কেন? কারণ তো অবশ্যই আছে, শুনতে ফিরতে হবে যে খানিকটা ফ্ল্যাশব্যাকে।

বোলিংয়ের পূর্বে ব্যাটিং করার মুহুর্তে মার্ভ ডিলনের বাউন্সার আঘাতে চোয়াল ফেটে গিয়েছিল কুম্বলের, রক্ত ঝরে পড়েছিল ফোঁটা ফোঁটা করে; সবুজ মাঠ হচ্ছিলো লাল। সেই অবস্থাতেও সামান্য শুশ্রূষা নিয়ে ব্যাটিং চালিয়ে নিলেন কুম্বলে, কারণ সতীর্থ অজয় রাত্র যে তখন সেঞ্চুরীর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। কুম্বলে বিদায় নিলে যে সেই সেঞ্চুরীটা হয় না! অতঃপর যখন প্যাভিলিয়নে ফিরলেন, দেখা গেল যতটা ভাবা হয়েছিল, আঘাত তার থেকেও বেশ গুরুতর। চোয়াল ভেঙেছে, ভেঙেছে দাঁতও। প্রয়োজন অস্ত্রোপচারের।

কিন্তু, বোলিং করতে নেমে ভারত দল যখন বিপদে, ব্রায়ান লারা দাঁড়িয়ে আছেন চীনের প্রাচীর হয়ে। ড্রেসিংরুমে বিশ্রামে থাকা অনিল কুম্বলে আর বসে থাকতে পারলেন নাহ। নেমে এলেন মাঠে, হাতে তুলে নিলেন বল। মাথাজুড়ে সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা, সেখানে রক্তের লাল ছোপটা তখনও মিলিয়ে যায়নি। অতঃপরের গল্পটা তো বলেছিই খানিকটা পূর্বে। এভাবেই ভাঙা চোয়াল চেপে, মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে কুম্বলের বাইশগজ আঁকড়ে থাকাটা আজ ইতিহাসে অমরত্ব পেয়েছে।

এ তো গেল একজন কীর্তিমান আর সাহসী কুম্বলের স্মৃতিকথা। কিন্তু একজন আদর্শ ব্যক্তিত্বের অধিকারী কুম্বলের গল্পটা তো আড়ালেই রয়ে গেল। টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার তিনি, ৬১৯টি টেস্ট উইকেট তার ঝুলিতে, তবুও মুরালি বা ওয়ার্নের মতো উদ্দাম আলোচনা হয় না তাকে নিয়ে। কখনও তারকা ছিলেন না, হতেও চাননি। খবরের শিরোনাম হবার বাসনা ছিল না তার মধ্যে। আড়ালে থেকে নিজের কাজটা করে গেছেন বরাবর, নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন মাঠে। বাদানুবাদে জড়াননি কখনও, স্লেজিং করে প্রতিপক্ষকে বিরক্তও করেননি। ক্রিকেটটা যে ভদ্রলোকের খেলা, সেটার প্রমাণ বারবার দিয়েছেন তিনি।

তার ৫১ তম জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

শুভ জন্মদিন জাম্বু।