ফিচারঃ বাঘের গল্প– ১ | রকিবুল হাসান

বিশ্ব মানচিত্রে ছোট্ট একটা দেশ লাল-সবুজের বাংলাদেশ। কিন্তু যখন বলা হয় ক্রিকেট বিশ্ব, তখন? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ একটা বড় নাম। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়েছে বাংলার ক্রিকেট। বিস্ময়ের আশরাফুল কিংবা বিশ্বসেরা সাকিব, কীর্তির নথিতে নতুন করে লিখেছেন বা লিখে চলেছেন বাংলাদেশের নাম। মতপার্থক্য দূরে ঠেলে এই ক্রিকেটই আমাদের এক কাতারে আনে, একই সুতোয় গাঁথে, হাসায় রোমাঞ্চিত করে, আবার না পাওয়া কিংবা হারানোর বেদনায় কাঁদায়, সেই ক্রিকেটের বাংলার ফেরিওয়ালাদের নিয়ে আমাদের আয়োজন- “বাংলার ক্রিকেটের বাঘ”। প্রকাশিত হবে সপ্তাহের প্রতি সোমবারে।

দলের আর দশজনের মতো তাকেও একটি দেয়া হল, ‘গ্রে-নিকোলস’ ব্যাট। ব্যাটে লাগানো ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) লোগো সম্বলিত একটি স্টিকার, যা চোখ এড়ায়নি তাঁর। একজন নিবেদিত প্রাণ বাঙালী বলে বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি তিনি। ভাবলেন দীর্ঘক্ষণ, শলা-পরামর্শ করলেন আর অতঃপর যা করলেন তা আজও ইতিহাসকে নাড়িয়ে দেয়।

পরদিন টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন দলের অধিনায়ক ইন্তিখাব, আর আজমত রানার সঙ্গে উদ্বোধনি ব্যাটিং করতে নামলেন তিনি। আর তখনই সকলে অবাক হয়ে দেখল, ব্যাটে পিপিপি’র লোগো বসানো স্টিকার নেই। তার পরিবর্তে সেখানে বাংলাদেশের মানচিত্র আর গোটা গোটা করে লেখা এক স্টিকার, ‘জয় বাংলা’!

গোটা মাঠ গর্জে উঠল সেই হর্ষধ্বনিতে, “জয় বাংলা” স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল চারদিক। টেকনাফ হতে তেতুলিয়া পুরো বাংলা জ্বলে উঠলো জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে। মুক্তিযুদ্ধের আগে সেটাই ছিল ইয়াহিয়া’র কূটচালের বিরুদ্ধে সাহসিকতা এবং তারুণ্যে উদ্দীপ্ত একটা বার্তা, “জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবুও মাথা নোয়াবার নয়”!

ম্যাচটা ছিলো কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে পাকিস্তান একাদশের একটি বেসরকারি টেস্ট। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার আগে শেষ মুহূর্তে ইয়াহিয়া খান বাঙালীদের বশে আনার উদ্দেশ্যে রাজনীতির খেলায় পুতুল হিসেবে বেছে নিলেন এই ক্রিকেটকেই। ম্যাচ আয়োজন হলো তাই ঢাকার মাটিতে। ‘পোস্টারবয়’ হিসেবে পাকিস্তানি প্রশাসন কাজে লাগাতে চাইলো তাকে; রকিবুল হাসানকে!

পাঠক, বলা হচ্ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তী রকিবুল হাসানেরই কথা! ওই সময়ের মাত্র ১৮ বছরের এক বাঙালী তরুণ তিনি। আগামীর ক্রিকেটে এক অপার সম্ভাবনা। এরই মাঝে খেলেছেন প্রথম শ্রেনীর কিছু ম্যাচও। পারফরম্যান্সও ছিল নজরকাড়া। এমনকি, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে দ্বাদশ ক্রিকেটার হিসেবেও দলে রাখা হয়েছিল তাকে। তবে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি।

তা অবশ্য সেদিনই বুঝে গিয়েছিলেন রকিবুল। সাদা জার্সি পরে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের স্বপ্নটা দেখার আগেই উবে গেল। তাইতো, বিদায় সম্ভাষণ জানাতে গিয়ে জহির আব্বাসকে রকিবুল বললেন, “জহির, পরেরবার পাকিস্তানে এলে হয়তো নতুন পাসপোর্ট নিয়েই আসব!” সেই শব্দগুলোতে নিশ্চয়ই বাঘের গর্জন শুনতে পেয়েছিলেন জহির আব্বাস।

এদিকে, এশিয়া টাইমস ইয়াহিয়া খানকে উর্ধ্বৃত করে বলল, “তিন মিলিয়ন মেরে দাও, বাকিরা এমনিই তাহলে আমাদের হাত চেটেপুটে খাবে।” সেদিনই বুঝে গেলেন রকিবুল, আর বসে থাকা চলবে না।  সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন। হাতের ক্রিকেট ব্যাট ছুঁড়ে ফেলে তুলে নিলেন বন্দুক। পাশে পেলেন তারই প্রিয় বন্ধু ক্রিকেটার আব্দুল হালিম চৌধুরী। এই আব্দুল হালিমই আমাদের শহীদ জুয়েল!

মুক্তিযুদ্ধ শেষে আবারও বাইশগজে নেমেছিলেন ব্যাট হাতে। তবে এবার আর পাকিস্তানের হয়ে নয়; লাল-সবুজের বাংলাদেশের হয়ে। অধিনায়কত্বও করেছেন স্বাধীন মানচিত্রের। কিন্তু সেই স্বপ্নের টেস্ট আর কখনও খেলা হয়নি তাঁর। কারণ, তখনও টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া হয়নি বাংলাদেশের।

Show More