ফিচারঃ স্বপ্নের টেস্ট স্ট্যাটাস আর পেছনের গল্প

ফিচারঃ স্বপ্নের টেস্ট স্ট্যাটাস আর পেছনের গল্প

 

টেস্ট স্ট্যাটাসের স্বপ্ন দেখাও তখন অনেকটা কৌতুকের মতো ছিল। কেউই বিশ্বাস করেনি এটা এত দ্রুত সম্ভব হবে। সাবেক এক ক্রিকেটার তো বোর্ড প্রেসিডেন্টকে বলেই ফেলেছিলেন “সাবের তুমি তো মজা করে বলছো কথাটা তাই না? এটাতো বাস্তবে সম্ভব না। আইসিসি কেন আমাদের এখন টেস্ট স্ট্যাটাস দিবে?”

জিম্বাবুয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় ১৯৯২ সালে। কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছিল তিন-তিনবার আইসিসি ট্রফি জেতার পরেও যদি টেস্ট স্ট্যাটাস না পায়, তবে জিম্বাবুয়েতে ক্রিকেটের মৃত্যু ঘটবে! বাংলাদেশ কি বলবে? আলাদা করে তেমন কিছু বলতে হয়নি, কেননা তখন এটা ছিল এক ধরনের অফ-ফিল্ড রাজনীতির বিষয়। টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার জন্য কোন নির্দিষ্ট নিয়ম ছিলোনা।

নিয়ম ছিল না কিন্তু দেখানোর জন্য হলেও সাফল্য প্রয়োজন ছিল। তাই কোচ হিসেবে উড়িয়ে আনা হয় গর্ডন গ্রিনিজকে। টার্গেট ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি। পরের অংশটা সবারই জানা। আইসিসি ট্রফি জয় আর ওয়ানডে স্ট্যাটাস প্রাপ্তি! একই সাথে হাতে আসে বিশ্বকাপে খেলার টিকেট। ওই ম্যাচেই মালেয়শিয়ার প্রবাসী বাঙালীরা জয়ের পর ব্যানার উঁচিয়ে ধরে, “বাংলাদেশ নেক্সট টেস্ট প্লেয়িং নেশন”

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ঘরের মাটিতে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন করা। প্রথম পদক্ষেপ ছিলো ১৯৯৮ সালে স্বাধীনতা কাপ আয়োজন। অতঃপর আয়োজন করা হয় প্রথম আইসিসি নকআউট বা মিনি বিশ্বকাপ (চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) এবং ভারকে নিয়ে ট্রাইনেশন কাপ। এরই মাঝে ঢাকা নিরপেক্ষ ভেন্যু হয়ে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনাল ম্যাচ আয়োজন করে। আর ‘৯৯ বিশ্বকাপ তো অম্লান ইতিহাস!

মূলত, এই টুর্নামেন্ট গুলো আয়োজনই প্রমাণ করে দেয় বাংলাদেশ আইসিসি’র পূর্ণ সদস্যপদ পাবার যোগ্যতা রাখে। মাঠভর্তি দর্শকের সমাগম খেলাটায় আইসিসির আর্থিক বিষয়গুলাও ফুটিয়ে তোলে। তাছাড়া, এদেশের মানুষের ক্রিকেটের প্রতি আন্তরিকতা ভালোবাসা আর আবেগ আইসিসিকে চিন্তিত করে তুলতে সক্ষম হয়।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

বাংলাদেশের ক্রিকেটের অকৃত্রিম বন্ধু বলা হয় জগমোহন ডালমিয়াকে। সেই সময় তিনি আইসিসি প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পর বিসিবি প্রেসিডেন্ট সাবের চৌধুরী ডালমিয়াকে টেস্ট স্ট্যাটাসের পক্ষে ভোটাভুটির আয়োজন করার অনুরোধ করেন। ডালমিয়া তখন সাবেরকে বলেন ওই মুহুর্তে ভোট দিলে বাংলাদেশ কেবল ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার ভোট পেতে পারে। বাকিদের ভোট পাবার জন্য বাংলাদেশকে টেবিল রাজনীতি করতে হবে। অর্থাৎ, সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াকে রাজি করাতে হবে। নয় পূর্ণ সদস্যের ভেতর অন্তত সাতটা ভোট প্রয়োজন!

এরপরই সাবের চৌধুরী নব-উদ্যমে কাজে লেগে যান। তখন ক্রিকেটে বোর্ডের এত কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা ছিল না। অনেক সময় ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকেও খরচ করতে হতো। তবে, সাবের চৌধুরী তাঁর কথা রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নিজ লক্ষ্যে তিনি অবিচল। আর তাই ভাগ্যও তাকে নিরাশ করেনি। কেননা, ভাগ্য সর্বদাই সাহসীদের সহায়ক হয়!

সেই সময় বাংলাদেশের কোচ হয়ে আসেন এডি বারলো। এডি বারলোর মাধ্যমে সাউথ আফ্রিকান বোর্ড প্রেসিডেন্ট আলি বুখারের সাহায্যে নিশ্চিত হয় সাউথ আফ্রিকার ভোট। একই সময়ে সাবের চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার গিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে পাশে থাকতে অনুরোধ জানান। অস্ট্রেলিয়া বোর্ড প্রধান আশার বাণী শোনালেও, ইংল্যান্ডের সমর্থণ নিশ্চিত ছিল না।

বাংলাদেশ দল কিছু আনঅফিশিয়াল ম্যাচ খেলার জন্য নিউজিল্যান্ড যায়। নিউজিল্যান্ড এর ঘরোয়া দলগুলার সাথে প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ খেলে। নিউজিল্যান্ডকে ম্যানেজ করার কাজটা তখনই করা হয়। আর জিম্বাবুয়ের প্রধান পিটার চিকোগাকে রাজি করানো হয় মেরিল কাপ চলার সময়।

১৯৯৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল আনঅফিশিয়াল ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে। সেসময় ইয়ান বিশপ মন্তব্য করেন বাংলাদেশ টেস্ট খেলার যোগ্য। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইয়ান বিশপকে বলা হয় তিনি যেন ফিরে গিয়ে ওয়েস্ট বোর্ডের প্রধান প্যাট রসুকে অনুরোধ করেন বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য। বিশপ তাঁর কথা রেখেছিলেন।

পাশাপাশি তৎকালীন সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটা দেশের রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানকে টেলিফোনে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। ভূমিকা রাখেন ওইসব দেশে নিযুক্ত রাষ্টদূত এবং হাইকমিশনাররাও। এরই মাঝে ২০০০ সালের শুরুতে আইসিসি থেকে ৩ সদস্যের পরিদর্শক দল পাঠানো হয় ঢাকায়। তারা সবকিছু দেখে সবুজ সংকেত দেয় আইসিসিকে।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

এরপর সেই মূহুর্ত। লন্ডন, ২৬ জুন ২০০০! আইসিসির বার্ষিকসভায় আইসিসি প্রধান ডালমিয়া প্রস্তাব তুলেন পক্ষে-বিপক্ষে ভোটের। বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে ৪৫ মিনিটের একটা রিপোর্ট উপস্থাপন করেন সাবের চৌধুরী। বাংলাদেশ আশা করেছিল ৭ ভোট কিন্তু মিটিং এর ভোট পর্বে ৯ দেশের প্রতিটি দেশই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের পক্ষে ভোট দেয়! ফলে আমরা পেয়ে যাই সেই স্বপ্নের টেস্ট স্ট্যাটাস!

CATEGORIES