ফিচারঃ ‘১৯ বিশ্বকাপের দুর্দমনীয় সাকিব

ফিচারঃ ‘১৯ বিশ্বকাপের দুর্দমনীয় সাকিব

 

ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ পূর্ব প্রস্তুতি পর্বটা একান্তে সারলেন, প্রিয় কোচকে উড়িয়ে নিয়ে। নিজ গরজে, নিজ খরচে। বিশ্বকাপ ঘিরে আলাদা পরিকল্পনার এ যেনো এক নিদর্শন! বুঝতে বাকি নেই, সাকিব চাচ্ছেন বিশ্বকাপের মঞ্চটা এবার স্বীয় আলোয় আলোকিত করতে, স্বীয় মুগ্ধতা ছড়িয়ে বিমোহিত করতে! সাকিব যখন ইচ্ছে করেছেন, দৃঢ়ভাবে চাচ্ছেন, তবে পরের গল্পটা কি হতে পারে? উত্তরটা বন্ধু তামিম ইকবাল পূর্বেই বলেছেন–

“সাকিব যেদিন চায়, সেদিন ও অদম্য! ও যদি এমনটা নিয়মিত চায়, তবে এমন সব কীর্তি গড়তে পারবে, যা বিশ্বের কেউ কখনও দেখেনি”

বছর দু’য়েক আগে সাকিবে মুগ্ধ হয়ে বন্ধু তামিম ইকবাল বু্ক ফুলিয়ে করেছিলেন উক্তিটি। সময়ে সময়ে বহু ক্ষণে সাকিবও দেখিয়েছেন বন্ধু তামিম ভুল বলেননি। আর তাঁর সব থেকে বড় প্রমাণ দিলেন ‘১৯ বিশ্বকাপ আসরে। যখন যেভাবে যা চেয়েছেন, তাই যেন করেছেন আসর জুড়ে। প্রতিটি মুহুর্তেই স্বীয় বিস্ময়ময় মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন ব্রিটিশ মূলূকে!

পরিসংখ্যানের বিচারে, সময়ের সেরা অলরাউন্ডার তিনি। আবার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরাদেরও একজন। তাতে সামান্য সন্দেহের অবকাশও সাকিব আল হাসান কখনো রাখেননি। কিন্তু গ্রেট আর সাধারণের পার্থক্যটায় বিশ্বমঞ্চের যে থাকে বড় এক ভূমিকা! তাইতো গ্রেটরা, বিশ্বমঞ্চে নিজেকে মেলে ধরেন সর্বদা,সবটুকু আলো নিজের করে নিতে চান। যা এবার করলেন, সাকিব আল হাসান!

কখনো যেমন দীর্ঘ লাফের শক্তি সঞ্চয়ে খানিকটা ঝুঁকে কুঁজো হতে হয়, শরীরটাকে গুটিয়ে নিতে হয়। কিংবা, ধনুক থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে তীরটাকেও একটু পিছু হটতে হয়। তেমনি করে যেন বিশ্বকাপটা সাজিয়েছে তিনি! কখনও রানরেট ধরে ধীরলয়ে খেলছেন, আবার কখনও ঝড় তুলছেন অবস্থা বুঝে। ভয়ঙ্কর গতির বলটিও সীমানার ওপারে পাঠাচ্ছেন দুমড়ে-মুচড়ে সিদ্ধহস্তে!

সেদিনও তার পথ চেয়ে ছিল ছোট্ট বাংলাদেশ। লাল-সবুজের এই ব-দ্বীপের অসংখ্য চা স্টল কিংবা মুদি দোকানের টিভি পানে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অগণিত চোখ। পুরো মাঠে চোখদ্বয় খুঁজে বেড়ায় একজনকে। যিনি কীর্তিগাথার সব সীমানা প্রাচীর ভেঙে, পুরো আসর জুড়ে বাঘের গর্জন ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিশ্বজুড়ে।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

ব্যাট হাতে সেদিন বাইশগজে মহা স্তম্ভ তিনি, ভূমিকাটা ঐতিহাসিক চীনের প্রাচীরের ন্যায় দূর্ভেধ্য-দূর্গম! অতঃপর মায়াবী বিভ্রম ভেল্কিময় স্পিন ঘুর্ণিতে উন্মাদনার উত্তাল তরঙ্গে ভাসালেন। বাঁহাতের মায়াবী কারুকার্যে বিস্মিত করলেন বিশ্বকে! শত মাইল দূরত্বেও নিদ্রাহীন বাঙালীর বাঁধন হারা উল্লাস আর বাধঁভাঙ্গা উচ্ছাসের উপলক্ষ সেদিন তিনি, একে একে পাঁচ-পাঁচবার!

লন্ডন, কার্ডিফ, ব্রিস্টল, টন্টন, আর নটিংহাম হয়ে এবার সাউদাম্পটনে, সাকিব এবার আক্রমণ করলেন সাপের মতো ফণা তোলা স্পিনে। অথচ, হুমকি-ধমকি ছিল, দর্প অহমিকা ছিল আফগান অধিনায়কের সুরে– রশিদ, মুজিব আর নবীর স্পিনত্রয়ীতে, দেখে নেয়ার গর্জন ছিল বুক ভরে। কিন্তু হায়! স্বীয় জালেই আটকা পড়ে হ্যাম্পশায়ার বোলে হাঁসফাঁস স্বয়ং তারাই।

ধারাবাহিক অসাধারণ ব্যাটিংয়ের পর এবার দুর্দান্ত বোলিং; বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনওকোনও বোলার হিসেবেই শুধু ৫ উইকেট পাননি, সেদিন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা বোলিংটাই করেছেন সাকিব। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং আর মস্তিষ্ক —সব বিভাগেই সাকিব সেদিন রাঙিয়ে ছিলেন স্বীয় রঙে; স্বীয় ঢঙে!

জ্যাক ক্যালিস, কপিল দেব, ইয়ান বোথাম কিংবা ইমরান খান –ক্রিকেটে আরও অসংখ্য কিংবদন্তি কীর্তিমান অলরাউন্ডাররাও বিশ্বকাপ খেলেছেন, বিশ্বকাপ মাতিয়েছেন। কিন্তু সাকিব যেথায় স্পর্শ করেছেন, তা কভুও কেউ পারেনি। বিশ্বমঞ্চে হাজার রান আর ৩০+ উইকেট শিকারে শিকারী শুধুই সাকিব আল হাসানই।

বিশ্বকাপে সেবার “সুন্দর” কীর্তির খনি যেন বারবার লুটিয়ে পড়েছে সাকিব চরণে। প্রশংসায় পঞ্চমুখ তাই ক্রিকেট দুনিয়া। ভারতের সাবেক পেসার জহির খান সাকিবকে ‘১১ এর ‘যুবরাজ সিং’ই মনে করছেন। তবে আদতে, সাকিব অনেক পূর্বেই পাড়ি দিয়েছেন সে পথ। যুবরাজ থেকে হয়েছেন রাজ! আমাদের রাজা!

       –আমরা সবাই রাজা, আমাদের এই রাজার রাজত্বে                নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?

CATEGORIES