ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

পান থেকে চুন খসেছে? দে কিল-ঘুষি, মারো লাথি…
চোখে গ্রামের বউ-ঝিদের অবস্থা যেন আবছা ভাবে ভেসে উঠলো। চায়ে চিনি কম হয়েছে? ধপাস থাপ্পড়! চায়ে চিনি বেশী হয়েছে? একটা কষে লাথি! পরিস্থিতি যাই হোক, দোষ সব বউটারই। যেন, যতো দোষ, নন্দ ঘোষ!

আবার সংসারের সব দায়-দায়িত্বও বউটার কাধেই। শুরু লগ্ন হতে শেষের শেষ সীমানা পর্যন্ত; শুভ্র ভোর হতে গভীর রজনী পর্যন্ত। তাতে কি? সর্বদাই তার লঘু পাপে গুরু দন্ড। বিপরীতে ভালো কর্মে কিংবা সাফল্যে, প্রশংসার পরিমাণ খুবই স্বল্প। এ যেন নিয়তির লিখন….

ক্রিকেটেও তেমনি একটা চরিত্র আছে, যাদের পান থেকে চুন খসলেই হলো। আলোচনা-সমালোচনা?এ আর তেমন কি? করা হয় অকথ্য ভাষায় গালাগালি। যাদের পরিচয়, বাইশ গজের কাকতাড়ুয়া! বলছিলাম আম্পায়ারদের কথা! ‘থ্যাংকলেস জব’ এর এই পেশাটি খুব বিরক্তিকর আর একঘেয়ে পেশা। বলা হয়ে থাকে, আম্পায়ারিং পৃথিবীর কঠিনতম পেশারগুলোর একটি।

__উপমহাদেশে আজ ক্রিকেটীয় বিপ্লবের ফলে, জাগরণ ঘটেছে ক্রিকেটের। ক্রিকেট মানেই এখন আবেগ আর ভালোবাসার ছড়াছড়ি। প্রিয় দলটা যখন মাঠে, সকল কাজ আর সব ভুলে পুরো জাতি তাকিয়ে থাকে ওই পানে। শিশু থেকে বুড়ো, সবাই গেঁথে যায় একটি সুতোয়। আর প্রতিটি কিশোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বাইশগজের পিচে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার; ক্রিকেটার হবার।

ছোট্ট বয়সে তেমনি স্বপ্ন ছিল তাঁরও, তবে ছিল সামর্থ্যে স্বল্পতা। লেগ স্পিন দিয়ে এগোতে পারেলেন না বেশী দূর। বিশেষ করে পাকিস্তানের মতো দেশে, হাতে খুব বেশি বৈচিত্র না থাকলে পথ যে সংকীর্ণ হবেই। ১৭টি প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ আর ১৮টি লীগ -এ ম্যাচেই থেমে গেল পথচলা; সমাধি হলো স্বপ্নের।

কি আর করা? পেট বাঁচাতে পাড়ি দিলেন মার্কিন মূলূকে। জীবিকার তাগিদে নানান চেষ্টা শেষে ব্যর্থ হয়ে, হাত দিলেন ট্যাক্সি গাড়িতে। কিন্তু এভাবে কতো দিন? এভাবে কতো আর? ক্রিকেট ঘিরে যার স্বপ্ন, ক্রিকেট থেকে দূরে তিনি থাকেন কি করে? জীবনের মানেটা খুঁজে নেয়ার উদ্দেশ্যে ফিরলেন পাক ভূমিতে; স্ব-দেশের মাটিতে।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

ক্রিকেট ঘিরে স্বপ্ন হলেও, তবে এবার আর ক্রিকেটার নয়; বাইশগজে ফিরতে চাইলেন, দু’দলের এগারো এগারো শেষে মাঠে থাকা আরও দু’জনের একজন হয়ে। অর্থাৎ, আম্পায়ার চরিত্রে। যেই চরিত্রটা অনেকটা গ্রাম্য বউয়ের ন্যায়! উপরেই যার খোলামেলা বিবরণ।

বিধাতা এবার আর নিরাশ করেনি; ২০০০ সালে জিন্নাহ স্টেডিয়ামে পাকিস্তান-শ্রীলংকার মুখোমুখি ওয়ানডে ম্যাচে আন্তর্জাতিক আম্পায়ার হয়ে অভিষেক ঘটে তাঁর। সুযোগ চলে আসে ২০০৩ বিশ্বকাপ আসরে আম্পায়ার ভূমিকায় অংশ নেয়ার। সেই বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়েই তাঁর একমাত্র কণ্যা অসীম শূন্যে পাড়ি জমায়; তাঁর আম্পায়ারিত্বে ব্যাঘাত হতে পারে ভেবে, তাকে না জানিয়ে পরিবার ঘটনাটি তখন ধামাচাপা দিয়ে দেয়!

যাহোক, সে বছরেরই অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড মধ্যকার একটি টেস্ট ম্যাচে, টেস্ট আম্পায়ারের ভূমিকায় তাঁর উত্থান। ধারাবাহিক নৈপুন্যের ফল হিসেবে ২০০৫ সালে আইসিসির বর্ষসেরা আম্পায়ার নির্বাচিত হন তিনি; পরের বছর আবারও। দুই বছরের বিরতিতে পুণরায় শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেন; এবার পর পর তিনবার!

২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট যেন তাঁর আম্পায়ারিং নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে। সেই আসরে তার বিরুদ্ধে আনীত ১৫ টি আম্পায়ার ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমে সবগুলোই পুণঃবিবেচনায় বাতিল সাব্যস্ত হয়। এরই মাঝে ২০১০ সালে তাকে পাকিস্তান সরকার প্রাইড অব পারফরমেন্স পদকে ভূষিত করে বিশেষভাবে সম্মানিত করে।

‘১১ বিশ্বকাপ যেখানে তাঁর রূপকথা, সেখানে পরবর্তী বিশ্বকাপ তথাঃ ‘১৫ বিশ্বকাপ আসর যেন তাঁর ক্যারিয়ারের গলার কাঁটা! সে বিশ্বকাপ আসরে বাংলাদেশের বিপক্ষে তার ভুল সিদ্ধান্তগুলো পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। হতবাক করে দেয় ক্রিকেট বিশ্বকে। তাঁর ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় নানা জন, নানা ভাবে। বাংলাদেশে তীব্র আন্দোলন হয়, পুড়ানো হয় প্রতিকৃতি।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে বাকী নেই কার কথা বলছি? বলছি আম্পায়ার আলিম দারের কথা। কথায় বলে, মানুষ মাত্রই ভুল করে। আম্পায়াররাও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। আর দশজন আম্পায়ারের মতো আলিম দারও বিভিন্ন সময় ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সমালোচিত হয়েছেন। তাতে হয়ত কারও কপাল পুড়েছে, কারও হয়ত খুলেছে। যদিও, কিছু কিছু শিশুতোষ ভুলগুলো সাধারণ মনে ভাবতে রহস্যময় লাগে।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

আম্পায়ার ভূমিকায় দুই দশক কিংবা এক কুড়ি বছর শেষে আজ আলিম দার একজন কিংবদন্তি আম্পায়ার। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৩২ টেস্ট ম্যাচে আম্পায়ারিং করার কৃতিত্ব তাঁর; আর মাত্র ২টি ম্যাচে আম্পায়ার ভূমিকায় বাইশগজে নামতে পারলেই ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসেও সর্বোচ্চ ম্যাচ আম্পায়ারিংয়ের রেকর্ড গড়বেন আলিম দার। এখন সংখ্যাটা ২০৮।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ৪৬ ম্যাচ নিয়ে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ৩৮৬ ম্যাচে আম্পায়ারিত্ব করার কীর্তিটা শুধুই তাঁর; ধারেকাছেও কেউ নেই আর। আজ বাইশ গজের এই কাকতাড়ুয়ার ৫২ তম জন্মবার্ষিকী। ক্রিকেটের কিংবদন্তি এই আম্পায়ার ১৯৬৮ সালের ৬ জুন পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন। –শুভ জন্মদিন আলিম সারওয়ার দার!

– আফফান উসামা, ক্রীড়া প্রতিবেদক।

CATEGORIES