ফিচারঃ কিংবদন্তিদের সুরে সুইং সুলতান।

ফিচারঃ কিংবদন্তিদের সুরে সুইং সুলতান।

ঘটনাটা ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমের; নিউজিল্যান্ড সফরে পাকিস্তান। শেল ট্রফিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে মাত্রই দলে সুযোগ পেয়েছেন জেমস পামেন্ট। ব্যাটিংয়ে প্রথম বলটা ছিল হাফ-ভলি ধরনের; সোজা সাইড স্ক্রিন বরাবর বলটা পাঠিয়ে দেন পামেন্ট। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে মৌচাকে ঢিল মেরে তিনি কি ক্ষতিটাই না করেছেন!

সাবেক এই কিউই ক্রিকেটার প্রায় দুই যুগ আগের ঘটনাটা মনে করে এখনও ভয়ে শিউরে ওঠেন। সেই চারের মারটায় যে প্রায় মরতেই বসেছিলেন পামেন্ট! তাকে প্রথম বলেই বাউন্ডারি হাকানোর দুঃসাহস যে বাঘা ব্যাটসম্যানদেরও ছিলো না।

সেই পামেন্টের ভাষায়-
“পরের শটটা মারবো কি মারব না তা নিয়েই আমি  ভাবছিলাম। তবে, এখন মনে প্রশ্ন আসে কেন এমন নির্বোধের মতো কাজ করেছিলাম সেদিন? যাহোক, পরের ডেলিভারিটা কেমন হতে পারে সেই অনুমানটা করেছিলাম। কিন্তু তা যে এত ভয়ঙ্কর হবে মোটেও বুঝতে পারিনি। ঠিক আগের বারের মতোই ডেলিভারি ছিল; কিন্তু ওই বলটা ছিল ৩৫ কিলোমিটার গতির!

ধুম করে আমার হেলমেটের সামনে এসে লাগল বলটা। হেলমেটের ব্যাজটা প্রচন্ড শব্দ করে আমার কাছেই এসে খসে পড়ল মাটিতে। পরের ডেলিভারিটি ব্যাট ছুঁয়ে স্লিপে দাঁড়ানো ইনজামাম উল হকের হাতে। আগের বলে কনকাশনের কারণে কিছু বুঝতে পারছিলাম না আমি। বগলের নিচে ব্যাটটা নিয়ে হাটা শুরু করি।

৩০ সেকেন্ডের মতো হেটেছি হয়তো, প্রায় বাউন্ডারি সীমানার কাছে চলে গেছি। এবং ওই সময় চেচামেচি শুনতে পাই। একজন আমাকে ডেকে বলছে, আরে তুমি তো ভুল পথে হাটছো? আসলে প্যাভিলিয়নের দিকে না গিয়ে চলে যাচ্ছিলাম গ্রাউন্ডসম্যানদের ছাউনিতে। মনে হচ্ছিল আবারও কি ঘুরব? এরপর গ্রাউন্ডসম্যানদের ছাউনিতেই চলে গেলাম”

বোলার কে ছিল জানেন?

দাদা কে চিনেনা এমন কে আছে? ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান প্রধাণ, ক্রিকেটের বাইশ গজেও গেয়েছেন গান। নিশ্চই নতুন করে দাদার পরিচয় দিতে হবেনা; বুঝেছেন যে সৌরভ গাঙ্গুলির কথাই বলছি। তারঁও একটা ঘটনা আছে সেই বোলারটিকে নিয়ে; ঘটনায় অন্য মুখ ভারতীয় ক্রিকেটে ইশ্বর শচীন টেন্ডুলকার।

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে শারজায় সিঙ্গার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। আর সেদিনই প্রথম সৌরভ সেই বোলারের মুখোমুখি হন। কি হয়েছিল সে ম্যাচে? শুনুন স্বয়ং সৌরভের ভাষায়-

“তখন ৮০’র কাছাকাছি রানে ব্যাট করছি। ম্যাচের শেষ কয়েক ওভার বাকি। বলার বল করতে এলো;  ওকে স্টেপ আউট করতে গিয়ে বোল্ড হলাম। তখন  ড্রেসিংরুমে শচীন আমাকে আলাদা করে ডাকল। বলল তুই এটা কী করলি? জানিস না দুনিয়ায় সেই একমাত্র বোলার যার বিরুদ্ধে স্টেপ আউট করা যায় না!”

– কে ছিল সে বোলার?

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

এখন যেই ঘটনাটা বলবো তার চরিত্রে স্যার ভিভ রিচার্ডস। ভিভ সম্পর্কে নিশ্চয়ই ধারণা দেবার প্রয়োজন হবেনা! বাঘা বোলারদের সীমানার ওপারে আছড়ে ফেলতে যার জুড়ি মেলা ভার, সেই ভিভকেও নাকানিচুবানি খাইয়েছিল সেই বোলারটি। এমনকি ভিভ তাতে বেশ রেগেও গিয়েছিলেন।

অবশ্য, ভিভের সেই রাগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ব্যাটিং-সাম্রাজ্যের অধিপতি ২২ বছরের উদীয়মান তরুণ তুর্কির হাতে হেনস্তা হওয়াটা হজম করতে পারেননি। কিভাবে ঘোলাজল খেয়েছিলেন ভিভ আর কি ঘটেছিল সেদিন, বলছেন এবার স্বয়ং বোলারটিই।

শুনুন তবে…১৯৮৮ সালের উইন্ডিজ সফর। বার্বাডোজ টেস্টে চতুর্থ দিনের শেষ ওভার। বেশ জোরেই বল করছিলাম। ভিভ তখন ব্যাটিংয়ে; একটা বাউন্সার দিলাম; কোনভাবে নিজেকে সরিয়ে নিলেও তাঁর বিখ্যাত মেরুন টুপিটা পড়ে গিয়েছিল মাথা থেকে! সে ম্যাচের দুই ইনিংসেই ভিভ আমার বলেই আউট হয়।

ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে ফেরার কিছুক্ষণ পরেই দেখি বাইরে খালি গায়ে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে রিচার্ডস। সেই দৃশ্য দেখে তো দারুণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভিভ গর্জে উঠে বললেন- “আবার যদি তোমাকে এ রকম করতে দেখি তাহলে খুন করে ফেলব”

– বোলারটি কে?

ক্রিকেট ইশ্বর শচীন তো গাঙ্গুলিকে সতর্কবার্তা দ্বারা বলারের অবস্থান তুলে ধরলেন, দেখি ক্রিকেটের বরপুত্র ব্রায়ান লারার বার্তা কি ছিল সেই বলারের উদ্দেশ্যে। বলছি লারার সুরেই-

“তাঁর বিপক্ষে একটা ম্যাচের আগে আমি ডেসমন্ডকে বলেছিলাম, ওর ওভারটা যেন ও কাটিয়ে দেয়। কেননা, আমি তাকে ফেইস করতে চাচ্ছিলাম না। তখন ডেসমন্ডও মৌন সম্মতি দিল। কিন্তু ওভার শুরু হবার পরেই আমাকে বিস্মিত করে ডেসমন্ড ১ রান নিয়ে আমাকে স্ট্রাইক দিয়ে দিল। আমি হতভম্ব। পরে বুঝলাম, ডেসমন্ডও ওকে ফেইস করতে চাচ্ছেন না”

বোলারটি কে জানেন?

___আচ্ছা বলছি বোলারের পরিচয়। তিনি ‘সুইংয়ের সুলতান’—এটুকু বললেই তো হলো। বুঝে ফেলেছেন নিশ্চয়ই, বলছি কার কথা? হ্যাঁ যিনি গতি, সুইং দিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করেছেন দেড় দশকেরও বেশি সময়। তাঁর সুইংয়ের বিষে নীল হয়নি এমন ব্যাটসম্যান খুঁজে পাওয়া যাবে না। হাতের তূণে একগাদা তীর নিয়ে বাইশ গজে নামতেন; প্রতিটি বলই যেনো ‘অনিশ্চয়তার করিডরে’। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানকেও দুবার ভাবতে হতো প্রতিটি বলটি নিয়ে। গতির সাথে সুইং নিয়ে ক্রিকেট মাঠটাকে রীতিমতো রণাঙ্গন বানিয়ে ফেলতেন তিনি। তিনি আর কেও নন; কিংবদন্তী ওয়াসিম আকরাম!

না…না… আজ পরিসংখ্যান কিংবা তার কীর্তিগাথা তুলে ধরবোনা, বলবো শুধু তার সম্পর্কে ক্রিকেটের মহারথীদের কি ভাবনা, কি বলেন তারা। দেখি চলুন-

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

◾চ্যাম্পিয়ন কাপ্তান কিংবদন্তী রিকি পন্টিংয়ের ভাষায়-

ওয়াসিম আকরাম আমার দেখা সেরা ৩ বোলারের মাঝে অন্যতম ও অনন্য!

◾স্টিফেন ফ্লেমিং তো সরাসরিই বলেছেন-

– আমি যতজন বোলারদের মুখোমুখি হয়েছি, তাদের মাঝে ওয়ার্ন হচ্ছেন সেরা স্পিনার এবং ওয়াসিম সেরা পেসার।

◾অ্যালান ডোনাল্ডের মূল্যায়নটা দেখুন-

– যখন আমি খেলা শুরু করেছি, তখন পেস বোলারদের মাঝে সেরা ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। আমি যাদের দেখেছি এবং যাদের বিরুদ্ধে খেলেছি, তাদের মাঝে ওয়াসিম ছিলেন সবচেয়ে স্কিলফুল এবং সম্পূর্ণ।

◾কিংবদন্তি পেসার কার্টলি অ্যামব্রোসের ভাষ্য-

– ফিট থাকলে সে বল নিয়ে যা খুশী করতে পারে। ফাস্ট বোলারদের মাঝে সে-ই সেরা।

◾ভারতের চ্যাম্পিয়ন কাপ্তান কপিল দেবের মত-

– আমার দেখা, ওয়াসিম আকরাম সর্বকালের সেরা পেস বোলার।

◾ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস কোন রাখঢাক না রেখেই বলে দিয়েছেন-

– আমার মতে, আমি যত বোলারের মুখোমুখি হয়েছি, তাদের মাঝে সেরা হচ্ছেন ওয়াসিম আকরাম। দুই দিকেই সুইং করতে পারার দক্ষতাই তাকে ভয়ংকর বানিয়েছে।’

◾সমসাময়িক খেলোয়াড় বাদে পরের যুগে যাকে সেরা ব্যাটসম্যান ধরা হয় সেই বিরাট কোহলিও ওয়াসিম সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রদ্ধায় অবনত। তিনি বলেন-

– যদি কখনও কোন বোলারের মুখোমুখি হতে আমার ভয়ের অনুভূতি হয়, তাহলে সেটা হচ্ছেন ওয়াসিম আকরাম।’

পুরো বিশ্ব যেখানে বাইশগজে তার বোলিং দর্শনে তৃপ্ত হয়, সেখানে স্বয়ং ওয়াসিম আকরাম প্রথম পৃথিবীর আলো দর্শনে তৃপ্ত হয়েছিলেন, আজকের এই দিনে ১৯৬৬ সালে লাহোরে। আজ এই কিংবদন্তীর ৫৪ তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন সুইং সুলতান; শুভ জন্মদিন ওয়াসিম আকরাম।

আফফান উসামা, ক্রীড়া প্রতিবেদক।

CATEGORIES