ফিচারঃ রোমাঞ্চকর রুদ্ধশ্বাস সেই ম্যাচগাঁথা!

ফিচারঃ রোমাঞ্চকর রুদ্ধশ্বাস সেই ম্যাচগাঁথা!


আনপ্রেডিক্টেবল!

ক্রিকেটের আলোচনায় শব্দটা শুনলে মনে ভেসে উঠে একটি দেশের নাম; একটা জাতির নাম। দেশটা পাকিস্তান। ক্রিকেটের বাইশ গজে যারা সর্বদা বৈচিত্র্যময় ঘোর রহস্যে আচ্ছাদিত একটা নাম! পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই যেন অনিশ্চিত সৌন্দর্য্যের মোহনীয় এক সুর…

এই সুরের উত্তাল তরঙ্গে বহুকাল বহুজন বিস্মিত বিমোহিত বিনোদিত হয়েছে বহুবার! কখনও ভাঙা পায়ে খুড়িয়ে খুড়িয়েই ইতিহাস; আবার কখনও উড়ন্ত পথচলায় হঠাৎ-ই ধপাস! রহস্যের ডানা মেলে কখনও ছুঁয়েছেন উচ্ছাস কখনও বা বেদনায় গ্রাস; সর্বনাশ!

তেমনি এক সুর বেজেছিল ২০১০ সালের ১৪ই মে তারিখে; অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ১০ বছর পূর্বে। যার বর্ণনায় কিংবদন্তী ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্র লিখেছিলেন- “পাকিস্তান দেখাল কেন তারা পাকিস্তান! পুরোনো সত্যিটা আবারও করলো প্রমাণ; —ওরা নিজেরাই জানে না, কী করবে কখন”!

কি হয়েছিল সেদিন সে ক্ষণে?
ঘোলাটে স্মৃতির মোহনায় চলুন যাই হারিয়ে-

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপের তৃতীয় আসর সেবার ক্যারাবীয় দীপপুঞ্জ ওয়েস্ট ইন্ডিজে। পাকিস্তান আগের দুবার ফাইনাল খেলেছে, তৃতীয় আসরে তারা আবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। সেমিফাইনালে লড়াই দুই মেরুর দুই দলের মাঝে! ক্রিকেট দর্শনও বিপরীতপান- পেশাদারিত্ব বনাম আবেগের তীর্থস্থান; অস্ট্রেলিয়া বনাম পাকিস্তান!

টস হেরে ব্যাটিংয়ে হঠাৎ-ই টুর্নামেন্টের ভিন্ন পাকিস্তানের উত্থান! নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও “রহস্যময়” বিস্ফোরণ। ব্যাটিং তাণ্ডবে অজিরা তখন এলোমেলো -ছত্রখান; শরীরী ভাষাতেও অসহায়ত্বের উদয়ন। আকমল ব্রাদার এ্যান্ড কোং ঝড় রুখবার সাধ্যি কার তখন?

সেন্ট লুসিয়ার ধীর উইকেটে ঝড়ের সূচনায় বড় ভাইজান, ছোট জনের ঝড় শেষটায়! কামরান ‘জীবন লাভে, অর্ধশতক ছুঁয়েছেন; উমর স্ব-মহীমায়। অষ্টাদশ ওভারের তিন ছক্কার ২৪ রান তারই প্রমাণ। ঝড় শেষে বিশাল সংগ্রহে পাকিস্তান- ১৯১/৬ (২০)!

লক্ষ্য তাড়ায় আমিরের পেসে কম্পন উঠে অজি লাইন-আপে! ১/১ থেকে ২৬/২, ৫৮/৩ অতঃপর ৬২/৪; পেরিয়েছে ৮ ওভার! খানিকটা প্রতিরোধে ১২.৩ ওভারে ১০৫/৫! অস্ট্রেলিয়ার চায় ৪৫ বলে ৮৭, অপরদিকে পাকিস্তান তখন রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ!

  ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

আরেকটি রূপকথা পাকিস্তান যখন লিখে ফেলবে বলেই মনে হচ্ছে, ছোট ভাই ডেভিড হাসির বিদায়, তখনই দৃশ্যপটে আবির্ভাব মাইক হাসির। সময়ের পাল্লায় রান-বলের সমীকরণ কঠিন হচ্ছে ক্রমশ!

শেষ ৭ ওভারে প্রয়োজন ৮৫, ৬ ওভারে ৮০, ৫ ওভারে ৭০…। স্মিথের বিদায়ে সপ্তম উইকেট যখন পড়ল, তখনও অস্ট্রেলিয়ার চাই ১৭ বলে ৪৮; এরই মাঝে ফিরে গেছেন ক্যামেরন হোয়াইটও। আজমলের শেষ ৫ বলে ১৪ আসায় শেষ দুই ওভারে প্রয়োজন ৩৪!

আমিরের ওভারে হাসির ১৬ রান সংগ্রহে, শেষ ওভারে প্রয়োজন ১৮ রান! প্রথম বলে জনসনের প্রান্ত বদলে যা দাড়ালো ৫ বলে ১৭ রানে। বাকি গল্পটা “আনপ্রেডিক্টেবল” পাকিস্তানের দুঃখগাঁথা বেদনাকাব্য! দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে বোলার সাঈদ আজমলের। মাইক হাসি যে খাবারটা মুখ থেকে কেড়ে নিলেন…

পরের তিন বলে ৬-৬-৪ -এর মারে স্কোর সমান; ম্যাচ ৩৬০° ঘুরে এখন অস্ট্রেলিয়ার হাতে। প্রয়োজন ২ বলে ১ রান! কিন্তু আজ দিনটা যে হাসির হাসির; বিশাল ছক্কায় পরিসমাপ্তি রোমাঞ্চকর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের। সেই সাথে “রহস্যময়” পাকিস্তানের বিদায়ে অস্ট্রেলিয়া ফাইনালের মঞ্চে!

টি-টোয়েন্টির স্মৃতিতে ছাপ রেখে যাওয়ার ক্ষমতা খুব কম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান সেমিফাইনালটি থাকছে ব্যতিক্রম হয়েই; “হারার আগে হার নয়” মনোভাবের জয়ের বিজ্ঞাপন হয়ে!

মাইক হাসির শেষ ১০ বলে ৩৮! কিংবা ২৪ বলে ৬০ রানের ইনিংসে রুদ্ধশ্বাস সমাপ্তির এই ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তারা এটি ভুলবেন কী করে! এই ম্যাচ বুঝিয়ে দিল ‘রুদ্ধশ্বাস’ শব্দটি এর আগে অকারণে ব্যবহার হয়েছে বহুবার; বিপরীতে “আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তান” প্রতীয়মান হলো আবার!

 

আফফান উসামা, প্রতিবেদক