ফিচারঃ গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী – থিবো কোর্তুয়া

ফিচারঃ গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী – থিবো কোর্তুয়া


 

“Being a goalkeeper is like being the guy in the military who makes the bombs – one mistake and everyone gets blown up”

মূলত গোলকিপিং নামক জিনিসটাকে আমরা যতটা সহজ ভাবে নেই, ততটাও সহজ না ব্যাপারটা। একটা ম্যাচ যেমন এক গোলকিপারই ঘুরিয়ে দিতে পারে, ঠিক তেমনি ভাবে ঠুনকো একটা ভুলের কারণে হাতের নাগালে থাকা ম্যাচ ছিটকেও দিতে পারে। এই শতাব্দিতে যারা কিনা গোল বারের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেকে সফল ভাবে মেলে ধরেছে তাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান মাদ্রিদের দেয়াল থিবো কোর্তুয়া।

★ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক পরিচিতি:

সে সবার মাঝে থিবো কর্তুয়া হিসেবে পরিচিত হলেও তার পুরো নাম থিবো নিকোলাস মার্ক কর্তুয়া। জন্মগ্রহণ করেন বেলজিয়ামের ব্রে নামক স্থানে ১৯৯২ সালের ১১ই মে।
তার পরিবারে রয়েছে তার বাবা-মা, এক ভাই, এক বোন এবং দুই সন্তান।

বলতে গেলে এক কথায় তাদের পুরো পরিবারই ভলিবল খেলার সাথে যুক্ত আছে অনেক বছর ধরেই। কেননা কর্তুয়ার বাবা মা দুজনই এক সময় ভলিবল প্লেয়ার ছিলেন। এছাড়াও বর্তমানে তার বোন ভ্যালেরিয়া বেলজিয়াম জাতীয় ভলিবল দলের খেলোয়ার।
২০১৫ সালের, ২৬শে মে তার প্রাক্তন স্প্যানিশ গার্লফ্রেন্ড মার্তার গর্ভে প্রথম সন্তান জন্ম নেয়! তার নাম রাখা হয় আদ্রিয়ানা। পরবর্তীতে এই জুটি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে তাদের সম্পর্ক শেষ করে, অথচ তখনও তার গর্ভে ছিলো কর্তুয়া ২য় সন্তান অর্থাৎ নিকোলাস। তাদের ব্রেকআপের এক মাস পর নিকোলাস জন্মগ্রহণ করে। এই ফাকে একটা কথা বলে নেই, অনেকেই হয়তো জানেন না কর্তুয়া একাধারে ডাচ, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ এবং ইংলিশ ভাষা খুব সহজেই সাবলীল ভাবে বলতে পারে।
যাইহোক এই বেলজিয়ান গোলকিপারের উচ্চতা ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। বর্তমানে খেলে থাকেন রাজকীয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে। তার জার্সি নম্বর ১৩!

বিশ্বসেরা গোলকিপারদের মধ্যে একজন হিসেবেই তিনি সবার কাছে পরিচিত। বিশ্বসেরা গোলকিপার হওয়ার মতো সব রকম এবিলিটিই তার মধ্যে আছে।

কর্তুয়ার পজিশনিং সেন্স অসাধারন। এছাড়াও তার একটি অসাধারণ এবিলিটি আছে সেটা হচ্ছে খুব দ্রুত সময়ে মাঠে থাকা সব ডিফেন্ডারদের সাথে কমিউনিকেট করা। ওয়ান টু ওয়ান কিংবা গোল বার মুখি শুট সেভেও তিনি বিশ্বমানের একজন। তার ৬ ফুট ৬ ইঞ্চির বিশাল দেহের ভালো এবং খারাপ উভয় দিকই রয়েছে।

ভালো দিক হলো তার লম্বা দেহের কারনে খুব সহজেই বিপক্ষ দলের ক্রস কিংবা হাওয়ায় থাকা বল নিজের দখলে নিতে পারেন।
আর খারাপ দিকটি হলো যখন বিপক্ষ দলের প্লেয়ার তার পায়ের ফাক বরাবর কিংবা মাটি ঘেঁষে শুট নেয়,তখন এই লম্বা দেহের কারন দ্রুত সেই বল ঠেকানোর মতো অবস্থায় যাওয়া যায় নাহ।
কিন্তু সব দিক বিবেচনা করলে সে নিসন্দেহে ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট গোলকিপার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড!

★ক্লাব ক্যারিয়ার:

উপরে আগেই বলেছিলাম তার বাবা মা ছিলেন ভলিবল প্লেয়ার। সেই অনুযায়ীই হয়তোবা তাকেও তৈরি করতে চেয়েছিলেন একজন ভলিবল প্লেয়ার হিসেবেই। কিন্তু ভাগ্য বিধাতার বিধির উপর যে কারো হাত নেই। তাই হয়তো মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই লোকাল ক্লাব ব্লিটিজেনের হয়ে নিয়মিত খেলা শুরু করেন তিনি। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে তার কোন নির্দিষ্ট পজিশন ছিল না। যদিওবা কর্তুয়া লেফট ব্যাক হিসেবেই খেলতে পছন্দ করতেন। সেখানে থাকতেই ধীরে ধীরে ফুটবলের প্রতি মনোনিবেশ করেন তিনি। এরপর তার ভাগ্যের দুয়োর খুলে যায়। ১৯৯৯ সালে রেসিং জেংক নামক ক্লাবের স্কাউট টিম আসে ব্লিটিজেনে। কর্তুয়ার খেলা তাদের সবাইকেই অবাক করে। তখন তাকে রেসিং জেংকের ইউথ টিমে নেওয়ার জন্য অফার করা হয়। সেও না করে নি।ফলশ্রুতিতে মাত্র সাত বছর বয়সেই রেসিং জেংকের ইউথ টিমে যোগ দেন তিনি। সেখানে যেয়ে একদা একটি অনুর্ধ্ব-০৯ ক্লাব টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হন তিনি। ফলে নিজের প্রতিভা সম্পর্কে বুঝতে পারেন এবং নিজেকে একজন গোলকিপার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করার কাজ শুরু করে দেন।
কিন্তু রেসিং জেংকে আসার পর তিনি দেখেন যে একই ক্লাবে তার আরও একজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন। সেও একই পজিশনে খেলে, তার নাম কোয়েন।

দুজনেরই বয়স প্রায় একই ছিল। কিন্তু কোয়েন তৎকালীন কর্তুয়ার চেয়ে একটু বেশি ট্যালেন্টেড ছিলো। সে যাইহোক ধীরে ধীরে তারা দুজনই এক সময়ে সিনিয়র টিমে প্রোমোশন পায়। কিন্তু কোয়েনের কারণে কর্তুয়া মূল একাদশে সুযোগ পেত না। কিন্তু নাহ এবার বোধ হয় ভাগ্য বিধাতা আর সহ্য করতে পারলেন না কর্তুয়া এরকম পরিস্থিতি।

সময়টা তখন ২০০৯ সাল, হঠাতই ইঞ্জুরিতে পড়েন তখনকার জেংক ক্লাবের ফার্স্ট চয়েজ কোয়েন। ভাগ্য খুলে যায় কর্তুয়ার। সুযোগের সদ্ব্যবহার কাহাকে বলে সেটাও সবাইকে দেখিয়ে দেন তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ২০০৯ সালের ১৭ই এপ্রিল জেন্টের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একের পর এক অসাধারণ পারফরমেন্স এর জন্য ২০১০-২০১১ মৌসুমে কোয়েনকে পেছনে দলের প্রথম পছন্দ বনে যান।

সেই মৌসুমে রেসিং জেংক জিতে নেয় বেলজিয়াম প্রো লীগ। যেখানে কর্তুয়া ছিলেন দলের সেরা প্লেয়ার। সেই মৌসুমে ৪০ লীগ ম্যাচে মাত্র ৩২ গোল হজম করেন তিনি, যেখানে ছিল ১৪টা ক্লিন শীট। বনে যান সেই মৌসুমে রেসিং জেংকের সেরা প্লেয়ার সহ বেলজিয়াম লীগের সেরা গোলকিপার।

এই পারফরমেন্স বেশ নজর কাড়ে চেলসি ম্যানেজমেন্টের।
ফলশ্রুতিতে পরের মৌসুমেই ২০১১ সালের জুলাই মাসে জেংক থেকে চেলসিতে আসেন কর্তুয়া। তার ট্রান্সফার ফি ছিল প্রায় ৯ মিলিয়ন, চুক্তি হয়েছিল পাঁচ বছরের।

অতঃপর চেলসিতে যোগ দেওয়ার সপ্তাহ খানেক বাদেই চেলসি তাকে স্প্যানিশ জায়ান্ট এথলেটিকো মাদ্রিদের কাছে লোনে পাঠায়। এ্যাথলেটিকো থেকে ইউনাইটেডে সদ্য ট্রান্সফার হওয়া ডেভিড ডি গিয়ার ১৩ নাম্বার জার্সি দেওয়া হয় তাকে।
২০১১ সালের ২৫শে আগস্ট ইউয়েফা ইউরোপা লীগে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে এ্যাথলেটিকোর হয়ে অভিষেক হয় কর্তুয়ার। যেখানে ৪-০ এর সহজ জয় পায় কর্তুয়ার দল।

এই ম্যাচের তিন দিনই পরই লা লীগায় ডেব্যু হয় তার। অভিষেক ম্যাচেই ওসাসুনার হোম গ্রাউন্ডে টানা ২য় ক্লিন শিট ধরে রাখেন তিনি। ম্যাচটি ড্র হয় ০-০ গোলে! লীগে অভিষেকের পর প্রথম ছয় ম্যাচের চারটিতেই ক্লিন শিট ধরে রাখেন। ফলে ম্যানেজমেন্ট তার উপর ভরসা রাখে এবং সার্জিও এসেঞ্জোকে সরিয়ে প্রথম গোলকিপার হিসেবে কর্তুয়া কে রাখা হয়।

তারিখটা ছিল ২০১১ সালের ২৬শে নভেম্বর, সবার অপেক্ষার পালা শেষ করে শুরু হয় মাদ্রিদ ডার্বি। মুখোমুখি দুই নগর প্রতিদ্বন্দ্বী। কেউ কি তখনও একটি বারের জন্যও ভেবেছিল কর্তুয়া এক সময় রিয়ালের ডেরায় যোগ দেবেন?
সে যাইহোক, ওই ম্যাচেই নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম লাল কার্ড দেখেন কর্তুয়া। ডি-বক্সের মধ্যে ফাউল করে বসেন কারিম বেঞ্জেমাকে। ফলে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। তার পরিবর্তে মাঠে নামেন সার্জিও এসেঞ্জো। অবশ্য এটা কোন ইফেক্ট ফেলতে পারেনি মাঠের খেলায়।

পেনাল্টি থেকে ঠিকই গোল করেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
রিয়েল মাদ্রিদও ম্যাচটি জিতে নেয় ১-৪ এর বড় ব্যবধানে।
সেই মৌসুমে ঠিকই ইউয়েফা ইউরোপা লীগের ফাইনালে উঠে যায় এ্যাথলেটিকো, দেখা হয় স্প্যানিশ ক্লাব এথলেটিক বিলবাও এর সাথে। ম্যাচটি নিয়ে যতটা না আলোচনা হয়েছিল কিংবা সবাই জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বীতা আশা করেছিল তার ছিটে ফোঁটাও ম্যাচে ছিল না। ম্যাচটি অনেক সহজেই জিতে নেয় এ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ। কর্তুয়ার ক্লিন শিটের ধারা অব্যাহত থাকে, এ্যাথলেটিকো ম্যাচ জেতে ৩-০ ব্যবধানে।

  ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

কর্তুয়া জিতে নেন মাদ্রিদ ক্যারিয়ারে তার প্রথম শিরোপা। সফল একটি মৌসুম শেষ করেন তিনি। আরও কঠিন পরিশ্রম করে যান পরবর্তী মৌসুমের জন্য।

শুরু হয়ে যায় ২০১২-২০১৩ মৌসুম।
ভাগ্যের কি খেলা সেই মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই ইউয়েফা সুপার কাপে মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ছিল তাকে লোনে পাঠানো চেলসি।
মোনাকোতে সেই রাতে এ্যাথলেটিকোর সামনে পাত্তাই পায় নি চেলসি। ম্যাচটি খুব সহজেই ৪-১ এর ব্যবধানে জিতে নেয় এ্যাথলেটিকো। সেই মৌসুমটা সপ্নের মতো কাটতে থাকে তার জন্য। একের পর এক ক্লিন শিট ধরা দেয় তার গ্লাভসে!
এ্যাথলেটিকোর জার্সি গায়ে এক ইতিহাস রচনা করেন তিনি। এ্যাথলেটিকোর ইতিহাসের প্রথম গোলকিপার হিসেবে টানা ৮২০ মিনিট জালে কোন গোল জড়াতে দেননি তিনি। পরে অবশ্য রিয়াল সোসিয়াদাদের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে ক্লিন শিটের এই ধারা ভেঙে যায়!

গত মৌসুমের মতো এবারও নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালের সাথে দেখা হয় এ্যাথলেটিকোর। তবে এবার দেখা কোপা দেল রে এর ফাইনালে। যেখানে ১৪ বছর পর এ্যাথলেটিকো রিয়ালকে প্রথমবারের মতো হারায়। ম্যাচে দু দলই দাপট দেখায়, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় এক কর্তুয়া। সেই ম্যাচ এ্যাথলেটিকো জেতে ২-০ ব্যবধানে। ম্যাচে অসাধারণ খেলেন কর্তুয়া। ফলে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচও নির্বাচিত হন তিনি।
এছাড়াও পুরো মৌসুম জুড়ে ছিলেন দুর্দান্ত। ফলশ্রুতিতে নির্বাচিত হোন লা লীগা গোলকিপার অফ দ্যা ইয়ার ২০১৩ এবং লা লীগা জামোরা ট্রফি ২০১৩!

পরের মৌসুমে তার অপেক্ষা করছি আরও বড় সাফল্য। মৌসুমের শুরু থেকে একের পর এক দুর্দান্ত পারফর্ম করে যেতে থাকেন তিনি।
কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসে চেলসি এক হাত দিয়ে বসলো এ্যাথলেটিকোকে।

মূলত সেই মৌসুমে ইউসিএলের সেমির ড্রতে চেলসির প্রতিপক্ষ হিসেবে নাম আসে এ্যাথলেটিকোর। এতেই বাধ সাধে চেলসি। তারা ইউয়েফার কাছে দাবী করে তারা কর্তুয়া কন্ট্রাক্ট এর Terms Condition এ উল্লেখ করেছিল যে যদি এ্যাথলেটিকো তাকে চেলসির বিপক্ষে মাঠে নামায় তাহলে প্রতি ম্যাচের জন্য চেলসিকে €৩ মিলিয়ন দিতে হবে। কিন্তু এ দাবী প্রত্যাখ্যান করে এ্যাথলেটিকো ম্যানেজমেন্ট। পরবর্তীতে ইউয়েফা রায় দেয় যে কর্তুয়া কে খেলানোয় কোনো বাধা নেই এ্যাথলেটিকোর এবং তাদের কোন প্রকার অর্থও দিতে হবে না চেলসিকে।

সেমিতে চেলসি বাধা টপকে যায় এ্যাথলেটিকো। ফলে ফাইনালে আবারও দেখা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তাদেরই নগর প্রতিদ্বন্দী রিয়ােল। সেই মৌসুমে লা লীগা জিতে এ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ যেখানে কর্তুয়া অপরিহার্য অবদান রাখেন। লা লীগার সেরা গোলকিপারের জন্য নমিনেশনও পান তিনি।তার বাকি দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল উইলি ক্যাবায়ারো এবং কেইলর নাভাস।

যাইহোক, চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় পর্তুগালের লিসবনে। সেই ম্যাচ কর্তুয়ার জন্য সুখকর না হলেও মাদ্রিদিস্তাদের মনে আজীবনই গেঁথে থাকবে। বিশেষ করে রামোসের সেই ঐতিহাসিক হেডে করা গোলটা।

সেই ম্যাচে ৪-১ ব্যবধানে নগর প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ইউসিএল হাত ছাড়া হয় এ্যাথলেটিকোর। কর্তুয়াও বঞ্চিত হোন ইউসিএলের স্বাদ থেকে। সেই মৌসুম এ্যাথলেটিকো ইউসিএল রানার আপ হয়েই শেষ করে। অন্যদিকে করতুয়া জিতে নেয় লা লীগা জামোরা ট্রফি সহ বেলজিয়ামের স্পোর্টস ম্যান অফ দ্যা ইয়ার।

পরের মৌসুমের শুরুর দিকেই জুনে জোসে মৌরিনহো জানায় কর্তুয়া চেলসিতে ব্যাক করবে। সে ১৩ নম্বর জার্সি পায়, যেটা আগে ভিক্টোর গায়ে দিতো।১৮ই আগস্ট মৌরিনহো কনফার্ম করে যে, বার্নলীর বিপক্ষে পিটার চেকের জায়গায় ম্যাচ স্টার্ট করবে কর্তুয়া। প্রথম ম্যাচে অবশ্য ক্লিন শিট ধরে রাখতে পারেননি তিনি। তবুও ৩-১ ব্যবধানে জয় পায় তার দল।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে প্রথম ক্লিন শিটের দেখা পান নিজের ২য় ম্যাচে। লেস্টার সিটির বিপক্ষে অসাধারণ কিছু সেভ করেন তিনি। ম্যাচে তার দল জয় পায় ২-০ তে। এরপর ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৪ তে চেলসির সাথে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ৫ বছরের চুক্তি করেন তিনি।

এর প্রায় একমাস পরই ইঞ্জুরি নামক অভিশাপের কবলে পড়েন কর্তুয়া। ৫ই অক্টোবর আর্সেনালের বিপক্ষে খেলার সময় প্রথম হাফে আর্সেনাল প্লেয়ার সাঞ্চেজের ধাক্কায় মাথায় ব্যথা পেয়ে তখনই মাঠ ছাড়েন তিনি। তৎক্ষণাৎ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। পরে অবশ্য সেই রাতেই তাকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চেলসির হয়ে ২০১৫ সালের ১লা মার্চ প্রথম ট্রফি জয়ের স্বাদ পান কর্তুয়া। টটেনহ্যাম কে লীগ কাপে ২-০ ব্যবধানে হারায় তার চেলসি।এছাড়াও সেই মৌসুমে লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েই লীগে শেষ করে চেলসি।

২০১৫-২০১৬ মৌসুম শুরু করেন এফএ কমিনিউটি শিল্ডের ম্যাচ দিয়েই। আর্সেনালের বিপক্ষে। যেখানে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় চেলসি। তার ঠিক ছয় দিন পর লীগ ম্যাচে প্রতিপক্ষ সোয়ানসি সিটি। কিন্তু সেই ম্যাচে যাচ্ছেতাই অবস্থায় পড়ে যান কর্তুয়া। সরাসরি রেড কার্ড দেওয়া হয় তাকে। অবশ্য সেই ম্যাচে এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে চেলসি, ম্যাচ ড্র হয় ২-২ গোলে। রেড কার্ড এর জন্য এক ম্যাচ মিস করেন। পরে ২৩শে আগস্ট ওয়েস্ট ব্রোমউইচের বিপক্ষে অসাধারণ পারফর্ম করে নিজের এবিলিটি সম্পর্কে আবারও জানান দেন সবাইকে। ম্যাচে ব্রোমউইচের প্লেয়ার জেমস মোরিসনের পেনাল্টি অসাধারণ দক্ষতার সাথে সেভ করেন। ফলে চেলসি ম্যাচ জিতে নেয় ৩-২ ব্যবধানে।

আবারও ইঞ্জুরি হানা দেয় তার ক্যারিয়ারে। ১১ই সেপ্টেম্বর ট্রেনিং চলাকালীন পায়ের ইঞ্জুরিতে পড়েন কর্তুয়া। কিন্তু এবারকার ইঞ্জুরি ভয়াবহ রূপ নেয়।চেলসি অফিসিয়ালি জানায় কর্তুয়ার ইঞ্জুরির জন্য তাকে সার্জারী করতে হবে। ফলে আগামী তিন মাস থাকবেন মাঠের বাইরে।

১৬ই এপ্রিল ঘটে যায় আরেক কান্ড, আরেকটি রেকর্ড যোগ করে নেন নিজের নামের পাশে। কিন্তু এবারকারের টা মোটেও সুখকর ছিল না। যাইহোক ঘটনায় আসি, ১৬ই এপ্রিল সিটির বিপক্ষে আবারও রেড কার্ড দেখেন তিনি। ফলে ইপিএলের ইতিহাসের ৬ষ্ঠ গোলকিপার হিসেবে একই মৌসুমে দুইবার রেড কার্ড দেখেন তিনি। ওভারঅল বিবেচনা করে দেখলে এই মৌসুমে বেশি একটা সুখকর ছিল না তার জন্য।

২০১৬-২০১৭ মৌসুমের শুরুর দিকে তাকে নিয়ে অনেক রিউমার চলে। কিন্তু সে মিডিয়ার সামনে সরাসরি সব রিউমার কে মিথ্যে বলে দাবী করে এবং বলেন,”আমি আরও অনেক বছর চেলসিতেই থাকতে চাই”
১০ দিন পর লীগের প্রথম ম্যাচে বার্নলীর বিপক্ষে ক্লিন শিট ধরে রাখেন তিনি। দল জেতে ৩-০ তে! এই ক্লিন শিটের মাধ্যমে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসের পর দীর্ঘ ১৩ ম্যাচ পর প্রথম ক্লিন শিটের দেখা পান তিনি। এরপর ধিরে ধিরে দেয়ালে পরিণত হন, যেন তাকে ভেদ করে গোল দেওয়া হয়ে ওঠে এক প্রকার অসম্ভব। সেই মৌসুমে অক্টোবরের ১ তারিখ থেকে নভেম্বরের বিশ তারিখ পর্যন্ত মোট টানা ছয় ম্যাচে ক্লিন শিট ধরে রাখে চেলসি। যাতে ছয় ম্যাচের সব কটিতেই চীনের প্রাচীর হিসেবে ছিলেন কর্তুয়া। এরপর কিছু ম্যাচে আবারও গোল হজম করলেও ১১ই ডিসেম্বর থেকে ২৬শে ডিসেম্বর মোট টানা চার ম্যাচ ক্লিন শিট ধরে রাখেন কর্তুয়া। ফলে টেবিলের শীর্ষে থেকেই ক্রিস্টমাসে যায় সব প্লেয়াররা।
২০১৭ সালের এপ্রিলে আবারও ট্রেনিং চলাকালীন সময়ে ইঞ্জুরির কবলে পড়েন তিনি। এর ফলে ইউনাইটেডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েন। ম্যাচে তার অভাব ছিল স্পষ্ট, সেই ম্যাচ চেলসি হারে ২-০ ব্যবধানে।
ইঞ্জুরি থেকে ফিরে ব্রোমউইচের বিপক্ষে ক্লিন শিট ধরে রাখেন এবং চেলসি ১-০ তে জিতে লীগ টাইটেল নিজেদের করে নেয়। এছাড়াও সেই মৌসুমে চেলসির হয়ে সে এফএ কাপের ফাইনাল খেলে। কিন্তু তার দল হেরে যায় ২-১ ব্যবধানে।
যাইহোক সেই মৌসুমে লীগে মোট ১৬ ক্লিন শিটের দেখা পান তিনি। ফলে গোল্ডেন গ্লাভও জিতে নেন এই বেলজিয়ান সুপার স্টার।

  ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

২০১৮ তে চারিদিকে তখন বিশ্বকাপের আমেজ। ঠিক তখনই নিজের বাচ্চাদের সাথে কাছাকাছি থাকতে চান তিনি এটা মিডিয়ার সামনে বলেন। তখন থেকেই মূলত কর্তুয়ার মাদ্রিদে আসার রিউমার শুরু হয়।

শুরু হয়ে যায় ফুটবল সবচেয়ে বড় আসর ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১৮! যেখানে সে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটি সম্ভবত তার ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচ ছিল। কেন বলা হয় একজন গোলকিপার যে কোন‌ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে, সেটা সেদিন গোটা ফুটবল বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তিনি। বেলজিয়াম ওয়ার্ল্ড কাপ না জিততে পারলেও কর্তুয়া জিতে নেন সেই বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপারের পুরুষ্কার।

ওয়ার্ল্ড কাপ শেষে রিয়ালের প্রতি আগ্রহ কিংবা ভালোবাসার কথা সরাসরি বলে দেন মিডিয়ার সামনে, রিয়ালে আসার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধলো আবারও সেই চেলসি ম্যানেজমেন্ট। তারা এই ট্রান্সফারব দিল একটা শর্ত। শর্ত টা ছিল এরকম যে যতদিন না পর্যন্ত চেলসির কর্তুয়ার রিপ্লেসমেন্ট পাবে, ততদিন পর্যন্ত কর্তুয়া ক্লাব ছাড়তে পারবেন না। কিন্তু ম্যানেজমেন্টের এই শর্তের একটুও তোয়াক্কা না করে উলটো সামার ব্রেকের পর ট্রেনিং এ না এসে ম্যানেজমেন্টকেই বাধ্য করতে লাগলেন যেন তারা ট্রান্সফারে হ্যা সূচক ইংগিত দেয়।

অবশেষে, ৮ই আগস্ট,২০১৮ সালে রিয়াল অফিসিয়ালি ঘোষণা দেয় কর্তুয়ার ট্রান্সফারের ব্যাপারে। ছয় বছরের চুক্তিতে বার্নাব্যুতে পা রাখেন তিনি।

  1. রিয়াল তার ট্রান্সফার নিশ্চিতের একদিন পরেই চেলসিও অফিসিয়ালি এনাউন্স করে।
    মাদ্রিদে এসেই জানালেন নিজের অনুভূতির কথা। মিডিয়ার সামনেই বললেন,“আজ আমি একটা স্বপ্ন পূরণ করেছি। আপনি বুঝতে পারবেন না, আমি কতটা খুশি। আমি নতুন একটা স্বপ্ন পূরণ করার সুযোগ পেয়েছি। ছোট বেলা থেকেই স্বপ্নটা আমি দেখেছি”
    মাদ্রিদে এসে তার ডেব্যু হয় সেপ্টেম্বরের এক তারিখে, লেগানেসের বিরুদ্ধে। যেখানে মাদ্রিদ ৪-১ এর সহজ জয় পায়। এরপরের অংশ শুধুই একটা দুঃস্বপ্নের মত। রোনালদোর বিদায়ে একের পর এক মাদ্রিদের ব্যর্থতা সাথে কর্তুয়ার কিছু ভুল। ফলাফল? সমস্ত দোষ গিয়ে বর্তায় তার মাথার উপরেই। তাকে ভালোবেসে কিছু না বরং অধিকাংশ মাদ্রিদিস্তাই নাম দেয় মানবতার ফাক। মাদ্রিদ কাটায় এক ট্রফিলেস সীজন।
    কিন্তু একটা কথা আছে না “ফর্ম ইজ টেম্পোরারি বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট”।
    হ্যাঁ সেটাই করে দেখিয়েছেন তিনি! ফুটবল বিধাতার বোধ হয় আর সহ্য হচ্ছিল না। তাই হয়তো জিজুর আগমনের পর ২০১৯-২০২০ মৌসুমে রিয়ালের জার্সি তে প্রথমে অনুজ্জ্বল থাকলেও উজ্জল ছিলেন বেলজিয়ামের জার্সি গায়ে। একের পর এক ক্লিন শিট বজায় রেখেছিলেন। তারপর সেই ফর্ম যেন মাদ্রিদেও নিয়ে আসলেন। টানা ৫২২ মিনিট ক্লিনশিট রেখে সবার চোখে দিকে তাকিয়ে যেন জবাব দিলেন যে “আমি এই ঐতিহ্যবাহী শভ্র সফেদ জার্সি তে খেলার যোগ্য”।
    নাভাসের রেকর্ড ভেঙে রচনা করলেন নতুন করে আরেকটা ইতিহাস।

★বেলজিয়ামের হয়ে কর্তুয়াঃ
কর্তুয়া প্রথম বেলজিয়াম দলে ডাক পান ২০১১ সালের অক্টোবরে এবং ডেব্যুও করেন সেই মাসেই। প্রতিপক্ষ ছিলো ফ্রান্স। প্রথম ম্যাচেই ক্লিন শিট ধরে রাখেন তিনি। ম্যাচ ড্র হয় ০-০ তে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই ম্যাচ দিয়েই সে বেলজিয়াম জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে ম্যাচ খেলার মাইলস্টোন স্পর্শ করেন।
২০১৪ বিশ্বকাপের সমস্ত কোয়ালিফাইং ম্যাচে তিনি বেলজিয়ামের হয়ে মাঠে নামেন। সেবার খুব সহজেই ওয়ার্ল্ড কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। ২০০২ সালের পর এই প্রথম তারা কোন মেজর টুর্নামেন্টের মূল স্টেজে পা রাখে। এই কোয়ালিফাইং ম্যাচ গুলোর মধ্যে মোট ১০ ম্যাচের ছয়টিতেই ক্লিন শিট রাখেন কর্তুয়া।
২০১৪ সালের ১৩ই মে ওয়ার্ল্ড কাপের জন্য ২৩ সদস্যের দল ঘোষণা করে বেলজিয়াম। দলে জায়গা পান থিবো কর্তুয়া। টুর্নামেন্ট মোট পাঁচ ম্যাচে মাঠে নামেন তিনি। যেখানে তার খেলা প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বেলো হরিজেন্তে ২-১ এ জয় পায় বেলজিয়াম। এরপর ওয়ার্ল্ড কাপে টানা দুই ক্লিন শিটের দেখা পান তিনি। প্রথমটা রাশিয়ার বিপক্ষে এবং ২য় টা সাউথ কোরিয়ার বিপক্ষে। ফলে কোয়ার্টারে কোয়ালিফাই করে বেলজিয়াম। কিন্তু কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় বেলজিয়াম।
দু বছর পর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয় ইউরো ২০১৬!
ইউরো বাছাইপর্বে মোট ১০ ম্যাচে আটটি তেই মাঠে নামেন তিনি। বাকি দুইটি ইঞ্জুরির কারণে মিস করেন। ১৬ বছর পর তারা ইউরোর মূল পর্বে জায়গা করে নেয়।
কর্তুয়ার বেলজিয়াম ইউরোর কোয়ার্টারে পৌছে যায়। প্রতিপক্ষ ওয়েলস, ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যায় ওয়েলশ। ফলে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় তারা। ম্যাচ শেষে কর্তুয়া হারের কারণ হিসেবে দোষ দেন তখনকার কোচ মার্ক উইল্মটসকে এবং বলেন এটা তার লাইফের সবচেয়ে বড় হতাশা হয়েই থেকে যাবে!
আবারও দু বছর পর একটা বড় টুর্নামেন্ট। লক্ষ্য ছিল তাদের ইতিহাসের সেরা দলটাকে নিয়ে নতুন করে ইতিহাস রচনা করা। সেই লক্ষ্যে বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছিল তারা। গ্রুপ স্টেজে মোট দুইটি ক্লিন শিট রাখেন কর্তুয়া, প্রতিপক্ষ ছিলো পানামা এবং ইংল্যান্ড ! কোয়ার্টারে ব্রাজিল বিপক্ষে সেই ম্যাচে যেন চীনের প্রাচীরে রূপ নিয়েছিলেন কর্তুয়া। একের পর এক নিশ্চিত গোল রক্ষা করেছেন তার বিশ্বস্ত হস্ত দ্বারা। বেলজিয়াম ম্যাচ জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে। ফলে ১৯৮৬ সালের পর আবারও ওয়ার্ল্ড কাপের সেমি ফাইনালে পা রাখে বেলজিয়াম।
সেমিতে দেখা হয় ফ্রান্সের সাথে। সেদিন এক গোলই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। নিভে যায় তাদের ইতিহাস সৃষ্টি করার প্রদীপটা। ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় বেলজিয়াম।
৩য় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে ২-০ তে জিতে বেলজিয়াম, ক্লিন শিটের দেখা পান কর্তুয়া।
সেই বিশ্বকাপে মোটে সাত ম্যাচে ২৭টা সেভ করেন তিনি, যা ছিল সর্বোচ্চ। ফলে বনে যান ২০১৮ ওয়ার্ল্ড কাপের সেরা গোলকিপার, জিতে নেন গোল্ডেন গ্লাভস!
৩য় হয়েই বিশ্বকাপ যাত্রা থেমে যায় বেলজিয়ামের।

আসলে প্রথম মৌসুমে চারিদিক থেকে যেই পরিমাণে ক্রিটিসিজম বা হেইটস্পিচ তাকে সহ্য করতে হয়েছে, এসবের মধ্যে থেকেও খুব কম খেলোয়াড়ই এভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারে।
“Form is temporary,But class is permanent” উক্তিটার জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি…

সবশেষে কর্তুয়ার ২৮তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো।