সেরা দশ মুসলিম ফুটবলারঃ আজ মোহাম্মদ সালাহ্

সেরা দশ মুসলিম ফুটবলারঃ আজ মোহাম্মদ সালাহ্


দ্যা মিশরীয় কিং মোহাম্মদ সালাহ

বর্তমান ফুটবল দুনিয়ায় বেশ কয়েকজন মুসলিম ফুটবলার ইউরোপীয়ান ফুটবলে মাঠ মাতাচ্ছেন।
এসব মুসলিম ফুটবলাররা মাঠ থেকে মাঠের বাইর সর্ব ক্ষেত্রেই তাদের স্রষ্টার কথা স্মরণ করেন। ধর্মের প্রতি তাদের আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে।
তাই আমরা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরবো ফুটবল মাঠের সেরা ১০ জন মুসলিম প্লেয়ারের গল্প।
সে ধারায় আজ তুলে ধরছি মিশরে ও লিভারপুলের তারকা ফুটবলার মোহাম্মদ সালাহর জীবনী।

৯ অক্টোবর ২০১৭।
২০১৮ বিশ্বকাপের আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে মিশরের শেষ ম্যাচ। ম্যাচ শুরুর আগেই উচ্চ রক্তচাপের কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল মিশরের কোচ হেক্টর কুপারকে কেননা এই ম্যাচ জিততেই হবে মিশরকে।

চলছে ১-১ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচ, খেলার তখন বাকি মাত্র ৬০ সেকেন্ড। স্টেডিয়ামে শিন-শন নিরবতা। সবার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, মিশর কি পারবে এই ম্যাচ জিতত? পারবে কি আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে যেতে?

সেই লক্ষ্যে শেষ আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টায় আছে মিশর, শেষ পর্যন্ত কঙ্গোর ডি-বক্সে ঢুকে যায় মিশরের প্লেয়ার। বিপদ মুক্ত করতে গিয়ে ফাউল করে বসে কঙ্গোর ডিফেন্ডার। রেফারির পেনাল্টির বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে উল্লাসে ফেটে পড়ে স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক। সেই সাথে কিছুটা প্রশান্তি পেল মোহাম্মদ সালাহ। তবে তখনও অর্ধেক কাজ যে বাকিই ছিল। মহামূল্যবান পেনাল্টি নিতে হবে এই সালাহকেই। কিছুটা নিশ্চুপ হয়ে বলের দিকে এগিয়ে গেলেন সালাহ। বাম ও ডান পাশে দর্শকদের দিকে তাকানোর পর কি মনে করে স্মরণ করলেন মহান সৃষ্টিকর্তাকেও।

স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শক এবং পুরা মিশরবাসি তখন তাকিয়ে আছে মোহাম্মদ সালাহর দিকে। তার একটা পেনাল্টি মিশরকে নিয়ে যাবে স্বপ্নের বিশ্বকাপে। তাই তো কিছুটা শান্ত হয়ে বল বসিয়ে পিছনের দিকে আসলেন। রেফারির বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে এগিয়ে গিয়ে তার বিখ্যাত বাম পা দিয়ে ডান পাশের খানিকটা উপরে শট নিয়ে গোল কিপার কে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ালেন। কঙ্গো কে হারিয়ে ১৯৯০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মিশর।

সালাহর এই এক গোলে মিশে ছিল আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা। তার এই এক গোলের পরই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল স্টেডিয়ামের দর্শক থেকে মাঠের ফুটবলার, কোচিং স্টাফরা।
সেদিন কান্না করেছিলেন মোহাম্মদ সালাহ তবে এ কান্না ছিল জয়ী হওয়ার কান্না। এ কান্না ছিল নিজ দেশ কে কোন কিছু দিতে পারার কান্না।

১৯৯২ সালের ১৫ই জুন মিশরকে আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ সালাহ।
ছোটবেলা থেকেই কিভাবে যে তার ফুটবলের প্রতি নেশা তৈরি হয়েছে তা সালাহ নিজেও বলতে পারে না। ছোট্ট বয়সেই যে ছেলে নিজ গ্রাম ছেড়ে কায়রোতে পাড়ি জমিয়ে স্যাক্রিফাইস করতে শিখে গেছিলেন সেই ছেলে বড় হয়েও কায়রো ছেড়ে আজ এ্যানফিল্ডে এসে সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে। শুধু মাত্র নিজ দেশের নাম উজ্জল হবে বলেই মিশর ছেড়ে ইংল্যান্ডে এসেছেন তিনি।

মিশরের ক্লাব এল মোকাওলনে নিজের ফুটবল শিক্ষার হাতে খড়ি পান সালাহ। ২০১০-১১ সালে মূল দলের হয়ে অভিষেক হয় তার। প্রথম সিজনে তেমন নিয়মিত না খেললেও পরের সিজনেই নিয়মিত ও অপরিহার্য প্লেয়ার হয়ে যান দলের। এই ক্লাবে থাকাকালীন মিশর অ-২৩ দলের হয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বাসেলে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে যান সালাহ। এ ম্যাচে সালাহর জোড়া গোলে ৪-৩ এ জয় পায় মিশর। তবে ম্যাচে সালাহর দিকে নজর রাখছিল এফসি বাসেল। এর সুবাদে ২০১২ সালে চার বছরের চুক্তিতে মোহাম্মদ সালাহকে দলে ভেড়ায় বাসেল।

  ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

২০১২-১৩ সিজনে বাসেলের হয়ে ইউরোপা লীগের কোয়ার্টার ফাইনালে টটেনহ্যামকে হারানোর রাতে গোল করেন সালাহ। সেমিফাইনালে স্ট্রামফোর্ড ব্রিজে চেলসির বিপক্ষেও গোল করেন সালাহ যদিও তার দল ৫-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকে।
তবে সে সিজনে বাসেলের হয়ে লীগ চ্যাম্পিয়ন হন সালাহ।
পরের সিজনে প্রথম ভাগে খুব একটা নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি সালাহ। তাই তো শীতকালীন দল বদলে বাসেল ছেড়ে চেলসিতে যোগ দেন। স্ট্রামফোর্ড ব্রিজে ২০১৩ সালের সেই গোলটাই হয়তো সালাহ কে আবারও স্ট্রামফোর্ড ব্রিজে ফিরিয়ে নিয়ে আসলো তবে এবার আসলেন চেলসির ঘরের ছেলে হিসেবে।

প্রথম সিজনে দলে নিয়মিত না হলেও বেশ কয়েকটা ম্যাচে মাঠে নামেন এবং গোলের দেখাও পান।
২০১৪-১৫ সিজনেও হোসে মরিনহোর অধীনে তেমন সুযোগ না পেলে মন খারাপ নিয়েই ধারে ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্তিনায় চলে যান সালাহ। ১৮ মাসের চুক্তিতে চেলসি ছাড়েন এই মিশরীয়।
ইউরোপা লীগে এই মোহাম্মদ সালাহর গোলেই টটেনহ্যামকে হারায় ফিওরেন্তিনা।
এরপরের ম্যাচেই ইন্টার মিলানকে হারানোর রাতেও স্কোর শীটে নাম লেখান মোহাম্মদ সালাহ।

৬ আগস্ট ২০১৫ তে ঘোষণা আসে ৫ মিলিয়ন ইউরো ও লোন শেষে স্থায়ী ভাবে দলে নিতে পারবে এমন চুক্তিতে আরেক ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমাতে ধারে যোগ দিচ্ছেন সালাহ।

প্রথম সিজনে বেশ কয়েকটি ম্যাচে দলের জয়ে অবদান রাখেন। ক্লাব ম্যানেজমেন্ট তার পার্ফমেন্সে খুশি হয়ে স্থায়ী ভাবে চুক্তি করে নেয়।
রোমার হয়েই নিজের ক্লাব ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাট্রিক করেন সালাহ।
রোমার হয়ে দারুণ পার্ফমেন্সের কারণে চোখ পড়ে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের।
রোমার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি দিয়ে মোহাম্মদ সালাহকে দলে ভেড়ায় লিভারপুল। মিশরের প্রথম প্লেয়ার হিসেবে লিভারপুলের জার্সি গায়ে চাপান সালাহ।

অল রেডদের হয়ে প্রথম ম্যাচেই গোলের দেখা পান।
ধীরে ধীরে সেই সিজনে লিভারপুল বস ইয়ুর্গেন ক্লপের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেন।
চ্যাম্পিয়ন লীগের কোয়ালিফাই ম্যাচ জিতে মূল পর্বে পা দেয় লিভারপুল।

চ্যাম্পিয়নস লীগের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মারিবরকে তাদের ঘরের মাঠে ৭-০ গোলে হারিয়ে প্রতিপক্ষের মাঠে সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়ে লিভারপুল।
লিভারপুলের জার্সিতে ২য় প্লেয়ার হিসেবে দ্রততম ২০ গোল করেন মাত্র ২৬ ম্যাচে।

ওয়ার্টফোড কে ৫-০ গোলে হারানোর রাতে মোহাম্মদ সালাহ একাই করেন ৪ গোল। এর ফলে প্রিমিয়ার লীগের সর্বোচ্চ গোলের লিস্টে সবার উপরে তার নাম উঠে আসে।

লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইন কে পিছনে ফেলে ইউরোপের টপ ৫ লীগের সর্বোচ্চ গোল তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে সালাহ। সবাইকে অবাক করে এই সিজনে প্রিমিয়ার লীগে ৩২ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেন।

  ফিচারঃ বাইশ গজের ব্যতিক্রমী কিংবদন্তি।

চ্যাম্পিয়নস লীগের সেমিফাইনালে তার সাবেক ক্লাব রোমার বিপক্ষে ২ গোল করে প্রথম আফ্রিকান প্লেয়ার হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লীগে ১০ গোল করার রেকর্ড গড়েন এই মোহাম্মদ সালাহ।
২০০৭ সালের পর আবারও লিভারপুল কে চ্যাম্পিয়ন লিগের ফাইনালে তোলায় মূল ভুমিকা রাখেন সালাহ।

ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচের ৩০ মিনিটে ইঞ্জুরির কারণে অশ্রুসিক্ত চোখ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ফাইনাল জেতার স্বপ্নটা সেদিন এই ইঞ্জুরি নামক শত্রুই কেড়ে নিয়েছিল।

ফাইনাল হারের স্বপ্ন নিয়ে নতুন সিজন শুরু করে ক্লপ ও তার শিষ্যরা।
ইঞ্জুরি থেকে ফিরে নতুন উদ্যোমে মাঠে ফিরেন মোহাম্মদ সালাহ। সিজনের শুরতেই বেশ কয়েকটা ম্যাচে গোল করে প্রথম প্লেয়ার হিসবে মাত্র ৬৫ ম্যাচে লিভারপুলের জার্সিতে ৫০ গোলের দেখা পান সালাহ।

এনফিল্ডে রোমার বিপক্ষে করা অসাধারণ গোলের জন্য ২০১৮ ফিফা পুস্কাস পুরস্কার জিতেন তিনি।
প্রিমিয়ার লীগে ম্যানসিটির কাছে মাত্র ১ পয়েন্টে পিছিয়ে থেকে প্রিমিয়ার লীগ হাত ছাড়া করে লিভারপুল তবে টানা ২য় বারের মত লিভারপুলকে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে তোলেন মোহাম্মদ সালাহ।

ফাইনালে আরেক ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যামকে ২-০ গোলে হারিয়ে ২০০৫ সালের পর আবারও চ্যাম্পিয়নস লীগের মুকুট অর্জন করে লিভারপুল।
ফাইনালে ম্যাচের দুই মিনিটের মাথায় গোল করে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালের দ্রুততম গোলের রেকর্ড করেন সালাহ।

২০১৯-২০ সিজনের শুরুতেই চেলসিকে টাইব্রেকারে ৫-৪ গোলে হারিয়ে ইউয়েফা সুপার কাপ চ্যাম্পিয়ন হয় লিভারপুল।
এরপর ২০১৯ ফিফা ব্যালন ডি’ওর ভোটে পঞ্চম হন এই মিশরীয় ফুটবলার।
বছরের একদম শেষে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেন সালাহ।

প্রতিটা ম্যাচে গোল করার পর আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য “সুজুদ” নামক উদযাপন করেন তিনি।
এটা এক ধরনের প্রার্থনার মধ্যেই পড়ে বলে জানান সালাহ। তবে সালাহ প্রতি ম্যাচেই মাঠে নামার আগে আল্লাহকে স্মরণ করে প্রার্থনা করেন।

অবাক করার মত একটা বিষয় হলো,
২০১৪ সালে মোহাম্মদ সালাহর প্রথম মেয়ে সন্তান জন্ম হয় যার নাম রাখা হয় মক্কা নগরির নাম অনুসারে “মেক্কা”।

মিশর কিংবা ইংল্যান্ড – দুই জায়গাতেই সালাহকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কেউ বলে, “দ্যা ফারাও” আবার কেউ বলে “দ্যা ইজিপ্সিয়ান মেসি”।
লিভারপুল ফ্যানরা বলে, “দ্যা ইজিপ্সিয়ান কিং”।

মোহাম্মদ সালাহকে নিয়ে আরও একটা অবাক করার মত বিষয় হলো,
“২০১৮ সালের মিশরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধান দুই প্রার্থীর সাথে সালাহর নামটাও ব্যালট পেপারে দেওয়া হয়। ভোট শেষে দেখা যায় মোহাম্মদ সালাহ ২য় স্থান অধিকার করেছে”।

মোহাম্মদ সালাহকে বুকে ধারন করে ফুটবল নিয়ে বেড়ে উঠছে আফ্রিকার হাজার হাজার তরুণ।
মোহাম্মদ সালাহর জন্য আজ মুসলিম দুনিয়ার ফুটবল প্রমীরা গর্ব করতে পারে।
গর্ব করতে পারে মিশরীয়রা।

মোহাম্মদ সালাহ বেঁচে থাকুক প্রতিটা ফুটবল প্রেমির হৃদয়ে।