ফিচারঃ মিস্টার ফ্রি কিক স্পেশালিষ্ট

ফিচারঃ মিস্টার ফ্রি কিক স্পেশালিষ্ট

 

ডেভিড বেকহামের জানা-অজানা কীর্তি

একজন ফুটবলারের পাশাপাশি যখন ফ্যাশন, বিজনেস বা অভিনয়ের ব্যাপারটা চলে আসে তখন নিঃসন্দেহে ডেভিড বেকহামের নামটা সবার মনে চলে আসে।

পুরো নাম ডেভিড রবার্ট জোসেফ বেকহাম। ফুটবল দুনিয়ায় স্টাইলিশ প্লেয়ারদের মধ্যে অন্যতম তিনি।
১৯৭৫ সালের ২রা মে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ইংল্যান্ডের লোকাল ক্লাব রিজওয়ে রোভারসের হয়ে ফুটবলের হাতি খড়ি শুরু হয় তার। দুই বছর পরেই যোগ দেন ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের যুব দলে যোগ দেন। এরপর মূল দলে নিজেকে সেরা প্রমাণিত করে স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ থেকে শুরু করে ইতালীর মিলান, ফ্রান্সের পিএসজি, আমেরিকার এলএ গ্যালাক্সি এবং নিজ দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। একমাত্র ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ভিন্ন চার টি লীগে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জিতেছেন তিনি।
২০ বছরের ক্যারিয়ার শেষ করে ২০১৩ সালের মে মাসে ফূটবল কে বিদায় জানান এই সুদর্শন ফুটবলার।

চলুন এবার জেনে আসি ডেভিড বেকহ্যামের জানা-অজানা কিছু কীর্তিঃ

★ফুটবল ক্যারিয়ারঃ

আপনার চোখে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সেরা ফ্রিকিক স্পেশালিষ্ট কে??
রবার্তো কার্লোস নাকি ডেভিড বেকহাম?
এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি কাউকেই বাদ দিতে পারবেন না। দুই জনকেই বেছে নিতে হবে।
তাই অবশ্যই এই ডেভিড বেকহামের নামটাও উচ্চারিত হবে। এছাড়া তার পাসিং ক্ষমতা, দুর্দান্ত ক্রস তার ক্যারিয়ারেরকে সৌন্দর্য্য আরও বৃদ্ধি করেছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ৬ টি প্রিমিয়ার লীগ সহ ১ টি চ্যাম্পিয়ন লীগ জিতেছেন। এরপর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লীগার স্বাদ গ্রহণ করেন। একমাত্র ইংলিশ প্লেয়ার হিসেবে চ্যাম্পিয়ন লীগে ১০০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন তিনি। বেকহাম হচ্ছেন সারা বিশ্বে মাত্র পাঁচজনের একজন এবং একমাত্র ইংলিশ প্লেয়ার যিনি ইংল্যান্ড, ইতালী ও স্পেন এই তিনটি লীগেই খেলেছেন। অন্য তিনজন হচ্ছেন রবিনহো, জ্বলাতান ইব্রহিমোভিচ, ফার্নান্দো তোরেস ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
জাতীয় দলে ৬ বছর অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

★ হলুদ ও লাল কার্ডঃ

মজার ব্যাপার হলেও সত্য যে প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে জাতীয় দলে দুইটি লাল কার্ড দেখার সৌভাগ্য হয় তার।
এর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দিয়গো সিমিওনেকে গুরুতর ফাউল না করেও লাল কার্ড দেখেন ডেভিড বেকহাম।
ক্লাব পর্যায়ে শুধু মাত্র রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪১ টি হলুদ কার্ডের বিপরীতে ৪ টি লাল কার্ড দেখেছেন তিনি। লাল কার্ডের সব গুলোই লা লীগায় পেয়েছেন। তার ক্লাব ক্যারিয়ারে গড়ে প্রতি ৬০ ম্যাচে ১ টি লাল কার্ড দেখেছেন তিনি।

★সুদর্শন ফুটবলারঃ

ডেভিড বেকহামের সুদর্শন চেহারা সব সময় অন্যের নজর কেড়েছে। নজর কেড়েছে ফুটবল মাঠেও। যেমন সুদর্শন তেমনি উচ্চতার অধিকারী ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পিপল ম্যাগাজিনে তাকে নিয়ে শিরোনাম দেওয়া হয় “সেক্সিয়েস্ট ম্যান এলাইভ”।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

★ডেভিড ও ভিক্টোরিয়াঃ

এরকম সুদর্শন ছেলের সাথে যে কোন মেয়েই সখ্যতা গড়ে তুলতে চাইবে। এরই সুবাদে ১৯৯৭ সালে ভিক্টোরিয়ার সাথে ডেটিং এর জন্য বেশ আলোচিত হন ইংলিশ মিডিয়ায়। মূলত মেয়েদের কাছের তিনি পরিচিত ছিলেন “পস স্পাইস” নামে। ১৯৯৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের রেস্টুরেন্ট “চেশান্ট” এ ভিক্টোরিয়া কে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এরপর ১৯৯৯ সালের ৪ জুলাই আয়ারল্যান্ডে গিয়ে জমকালো ভাবে বিয়ে করেন ভিক্টোরিয়াকে।

★ বেকহামের বিয়েঃ

বেকহাম ও ভিক্টোরিয়ার বিয়েতে আনুমানিক প্রায় ৬ লক্ষ ২৮ হাজার পাউন্ড খরচ হয়। ভিক্টোরিয়াকে একটি ডাইমন্ডের মুকুট উপহার দেন বেকহাম।
এই বিয়েতে মিডিয়া উপস্থিত ছিল না কেননা তাদের বিয়ের ছবি দিয়ে একটি ম্যাগাজিন তৈরি করা হয় যা বিক্রি করা হয় ১.৭৩ মিলিয়ন ইউরো দামে।

★বেকহামের সন্তানঃ

ডেভিড বেকহাম ও ভিক্টোরিয়ার চারটি সন্তান। অপ্রিয় সত্য হলেও তার প্রথম সন্তান তাদের বিয়ের আগেই জন্ম নেয়।
২০০২ সালে তাদের ২য় সন্তান জন্ম নেয়। এরপর মাদ্রিদে থাকাকালীন তাদের ৩য় এবং ২০১১ সালে তাদের চতুর্থ ও শেষ সন্তান জন্ম নেয়। বেকহামের ৩ সন্তান আর্সেনালের একাডেমি তে খেলে এবং বড় সন্তান মডেলিং করে।

★ ভিক্টোরিয়ার আদরের ডাক নামঃ

প্রতিটি স্ত্রীই তার স্বামীকে আলাদা নামে ডাকতে ভালবাসে। এদিক থেকে ভিক্টোরিয়াও ভিন্ন ছিলেন না। স্বামী ডেভিড বেকহাম কে আদর করে “গোল্ডেন বলস” নামে ডাকতেন।

★ বেকিংহ্যাম প্যালেসঃ

১৯৯৯ সালে ডেভিড ও ভিক্টোরিয়া প্রায় ২.৫ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে ইংল্যান্ডে একটি বাড়ি কিনেন।
যার নাম দেওয়া হয় “বেকিংহ্যাম প্যালেস”
দারুণ বৈচিত্রের এই বাড়িতে বসবাসের জন্য উত্তম পরিবেশ ছিল। এই বাড়ি কেনার জন্য অনেক বড় বড় ব্যক্তিই উঠে পড়ে লাগছিলেন তবে শেষ পর্যন্ত এই দম্পত্তি তা কিনে নেয়।

★ অনৈতিক সম্পর্কঃ

২০০৪ সালের এপ্রিলে বিশ্ব মিডিয়ায় জোরালো দাবি উঠে যে ডেভিড বেকহাম তার এসিস্টেন্ট “রেবেকা লাউসের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর অস্ট্রেলিয়ার “সারাহ মার্বেক দাবি করেন তিনি বেকহামের সাথে বেশ কয়েক বার রাত কাটিয়েছেন। তবে ডেভিড বেকহাম দুইটি দাবিকেই হাইস্যকর ভাবে শেষ করে দিয়েছেন।

★দ্রুত গতির চালকঃ
ড্রাইভ করতে কে না পছন্দ করে। এদিক থেকে ডেভিড বেকহামও ভিন্ন ছিলেন না। সুযোগ পেলেই গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যেতেন।
ডেভিড বেকহাম অবৈধ কাজের জন্য অনেক বারই শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য ২০১৯ সালে ৬ মাসের জন্য গাড়ি চালানো থেকে ব্যান হন তিনি।

  ফিচারঃ সৌরভের সৌরভে বিমোহিত বিশ্ব

★ সম্পদঃ

নিঃসন্দেহে ডেভিড বেকহাম অন্যতম তারকা ফুটবলার ছিলেন। বিভিন্ন ক্লাব ও জাতীয় দলে খেলার পর বর্তমানে তিনি আমেরিকান ক্লাব “মিয়ামি এফসির মালিকানায় বসেছেন। এছাড়া “স্যালফোর্ড সিটির মালিকানায় পিটার লিম, ফিল নেভিল, গ্যারি নেভিল, নিকি বাট, পল স্কোল্‌স ও রায়ান গিগসের সাথে বেকহামেরও অংশিদারিত্ব রয়েছে। প্রতিনিয়তই তার ফুটবল থেকে আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফুটবল ছাড়াও সে ফ্যাশনে বেশ মনোযোগী ছিলেন। তার স্ত্রী ভিক্টোরিয়া কে সাথে নিয়ে ফ্যাশন থেকেও অনেক টাকা আয় করেছেন। ২০০৭ সালে একটা বিজ্ঞাপনের জন্য তারা দুইজন প্রায় ১৩ মিলিয়ন ইউরো আয় করে।

২০০৩ সালে “এ্যাডিডাসের সাথে লাইফ টাইম চুক্তি করেন ১৬০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে।
সোসিয়াল সাইট থেকেও আয় করতে পিছিয়ে নেয় তিনি।
সোসিয়াল সাইট থেকে আয়ে ২০১৫ সালে মেসি ও রোনালদোর পরেই তার অবস্থান ছিল।

★ ট্যাটুঃ

ডেভিড বেকহামের শরীরে ৫০ টি ট্যাটু আকা ছিল।
এই ট্যাটু তে তার তিন সন্তান ও স্ত্রী ভিক্টোরিয়ার নাম লেখা ছিল।

★ মানবিক ক্ষমতাঃ

ফুটবলার ছাড়াও বেকহামকে সবাই মানবিক ব্যক্তি হিসেবেও জানতো। ২০০৫ সাল থেকে তিনি ইউনিসেফের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।
২০১২ সালে ইংল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সাথে ১০ জন পথশিশু কে পরিচয় করিয়ে দেন যাদের মাধ্যমে আরও অনেক পথশিশুর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
২০১৩ সালে পিএসজি থেকে আয় করা প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন ইউরো দান করেন দুইটি চ্যারিটিতে।
আফগানিস্তান ও ইরানের শিশুদের জন্য “হেল্প ফর হিরোস নামের একটি ফাউন্ডেশন তৈরি করেন।

★ অভিনেতা বেকহামঃ

২০০২ সালে বেকহামকে ঘিরে একটি মুভি তৈরি হয় যার নাম দেওয়া হয় “বেন্ড ইট লাইক বেকহাম”
তবে এই মুভিতে সরাসরি অভিনয় করেননি।
তবে পরিচালক গাই রিচির সাথে তার দারুণ সম্পর্কের কারণে “দ্যা ম্যান ফ্রম আঙ্কেল” “টাইগার কিং আর্থার” নামক দুইটি মুভিতে তাকে অভিনয় করতে দেখা যায়।

★শু-কন্ঠের অধিকারীঃ

ডেভিড তার কন্ঠের কারণেও সমাদৃত ছিলেন। ছোট বেলায় এই কন্ঠের কারণেও মানুষ তাকে আলাদা ভাবে চিনতো। তার কন্ঠের মাধুর্যতা বাড়ানোর জন্য ভয়েস লেসন নামক কোচিং এ ভর্তি হন তিনি।
এছাড়া বেশ কয়েকটা মুভিতেও তার ভয়েস ব্যবহার করা হয়েছে।

ফুটবল মাঠ থেকে মাঠের বাইরে, সব জায়গাতেই নিজেকে মেলে ধরেছেন দারুন ভাবে।
এত কিছুর পরও তার সুদর্শন প্রতিভা ও চোখ ধাঁধানো ফ্রিকিক নেওয়ার মুহুর্তটাই সবার মনে গেঁথে থাকবে।
গেঁথে থাকবে প্রতিটা ইংলিশ ফুটবল প্রেমীর হৃদয়ে।

শুভ জন্মদিন ডেভিড বেকহাম

CATEGORIES