ফ্লাশ ব্যাক – স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ জয়

ফ্লাশ ব্যাক – স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ জয়

রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা। ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নামকরা দুই ক্লাব। এই দুই ক্লাবেই খেলে থাকে স্পেনের অধিকাংশ তারকা ফুটবলাররা। স্পেন দলে তারকা খেলোয়াড়ের অভাব নেই, ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করে এই দুই ক্লাবই ও তাদের খেলোয়াড়রা অথচ বিশ্বকাপে “পেছনের বেঞ্চের ছাত্র হয়েই থাকতে হয় স্পেনকে!

ফুটবল বিশ্বের কাছে বিষয়টা ছিল ধাঁধার মতো। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসে খুলে সেই জট। পুরো বিশ্বকাপে স্পেনের মাত্র ৩ জন ফুটবলার গোল করে এবং জমাট রক্ষণে ৫ ম্যাচ ক্লিন শীট রেখে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্ব জয়ের আনন্দে মাতে স্প্যানিশরা।

চলুন আজ জেনে আসি স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ জয় যাত্রাঃ

গ্রুপ পর্বঃ

স্পেন ০-১ সুইজারল্যান্ড

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে প্রথম ম্যাচেই আঘাত হানে সুইসরা। ফার্নান্দেজের ৫১ মিনিটে করা গোলে ১-০ তে ম্যাচ জিতে নেয় সুইজারল্যান্ড। ৭৬ মিনিটে হ্যামিস্টিং ইঞ্জুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। এই হারে কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে চলে যায় দেল বস্কের স্পেন।

স্পেন ২-০ হন্ডুরাস

বাঁচা মরার লড়াইয়ে ২য় ম্যাচে হন্ডুরাসের বিপক্ষে মাঠে নামে স্পেন। জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবনায় ছিল না জাভি, ইনিয়েস্তাদের। আমেরিকার দল হন্ডুরাসকে তাই যেভাবেই হোক হারাতেই হবে। সেই লক্ষ্যে ১৭ মিনিটের মাথায় স্পেনকে এগিয়ে নেয় ডেভিড ভিয়া। ২য় হাফের ৫১ মিনিটের মাথায় আবারো ডেভিড ভিয়া গোল করলে ২-০ তে এগিয়ে যায় স্পেন। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি মিস করে হ্যাট্রিকের সুযোগ মিস করেন ভিয়া। এর ফলে ২-০ তে ম্যাচ জিতে স্পেন। বিশ্বকাপের প্রথম ক্লিন শীট রাখেন ইকার ক্যাসিয়াস। এই জয়ে ২য় রাউন্ডের আশা বেঁচে থাকে দেল বস্কের শিষ্যদের।

স্পেন ২-১ চিলি

এই ম্যাচে জয় পেলেই টেবিল টপার হয়ে ২য় রাউন্ডে পা দিবে স্পেন। ম্যাচের ২৪ মিনিটে ডেভিড ভিয়ার গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। এ ম্যাচেও স্পেনের ত্রাতা হয়ে আসেন ডেভিড ভিয়া। প্রথম হাফ শেষের আগেই ৩৭ মিনিটে চিলির জালে আরো এক বার বল জড়ান ইনিয়েস্তা। এতে ২-০ তে এগিয়ে যায় স্পেন। বিরতি থেকে ফিরেই ৪৭ মিনিটে চিলির মিলার গোল করে ২-১ ব্যবধান করেন। এরপর গোল পরিশোধের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পেরে উঠেনি চিলি। যার ফলে ২-১ গোলে ম্যাচ জিতে রাউন্ড অফ সিক্সটিন নিশ্চিত করে স্পেন।

  যেভাবে সেরা ক্রিকেটার বাছাই করে উইজডেন

রাউন্ড অফ সিক্সটিন

স্পেন ১-০ পর্তুগাল

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ বলেই কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন দেল বস্ক ও স্পেন। তবে ম্যাচে এর কোন প্রভাব পড়েনি। ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে কোন দলই গোল করতে পারেনি তবে বল পসেশনে এগিয়ে ছিল স্পেন। ২য় হাফে স্পেনের হয়ে ফার্নান্দো লরেন্তে মাঠে নামার পর খেলার গতি বাড়ে যার ফলে আবারও স্পেনের হয়ে গোল করে ১-০ তে এগিয়ে নেন ডেভিড ভিয়া। এছাড়া নিজের ২য় ক্লিন শীট রাখেন ক্যাসিয়াস। ভিয়ার এই এক গোলেই কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে স্পেন।

কোয়ার্টার ফাইনাল

স্পেন ১-০ প্যারাগুয়ে

ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় কিছুটা সাবধানি মনোভাবে ছিল দেল বস্কের স্পেন। ল্যাতিনের দল প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে গোল করতে ব্যর্থ হয় স্পেন। ২য় হাফের শুরুতেই প্যারাগুয়ে পেনাল্টি আদায় করে কিন্তু ইকার ক্যাসিয়াস দারুণ এক সেইভ করে স্পেনকে রক্ষা করে। ম্যাচের নাটকীয়তা তখনও বাকি। ডি বক্সের মধ্যে প্যারাগুয়ের প্লেয়ার ফাউল করায় পেনাল্টি পায় স্পেন। জাবি আলোন্সোর শট প্যারাগুয়ে গোলকিপার ফিরিয়ে দিলে জমে উঠে ম্যাচ। তবে ৮৩ মিনিটে আরও এক বার দলের ত্রাতা হয়ে দেখা দেন ডেভিড ভিয়া। তার গোলে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় স্পেন এবং আবারও এক গোলের জয় নিয়েই ১৯৫০ সালের পর সেমিফাইনালে যায় স্পেন।

সেমিফাইনাল

স্পেন ১-০ জার্মানি

জার্মানি স্পেনের ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। তাই তো এই ম্যাচ ঘিরে দর্শকদের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। ম্যাচ শুরু থেকেই দুই দল একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত কোন দলই গোলের দেখা পাচ্ছিল না। তবে ৭৩ মিনিটে জাভির কর্নার থেকে ডিফেন্ডার কার্লোস পুয়েল মাথা দিয়ে ম্যানুয়াল নয়্যারকে পরাস্ত করে ১-০ তে এগিয়ে নেন স্পেনকে। আবারও এই এক গোলেই ম্যাচ জিতে স্পেন এবং প্রথম বারের মত ফাইনালে যায়। এই ম্যাচেও দারুণ কয়েকটা সেইভ করে ক্লিন শীট রাখেন ইকার ক্যাসিয়াস

  ফিচারঃ বাঘের গল্প– ১ | রকিবুল হাসান

ফাইনাল

স্পেন ১-০ নেদারল্যান্ড

ইউরোপের দুই তারকা সমৃদ্ধ দলের ম্যাচ, তাই তো উত্তেজনায় ভরপুর ছিল। ম্যাচের আগেই আরিয়ান রবেন জানান যে, “ম্যাচ জিততে যদি শারীরিক ভাবে খেলতে হয় তবে তাই খেলব”। তিনি কথা আর কাজের মিল মাঠে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। দুই দলের খেলোয়াড়রাই অহেতুক ফাউল করায় ইংলিশ রেফারি এ ম্যাচে ১৩ টি হলুদ কার্ড দেখান। নির্ধারিত ৯০ মিনিট কোন দল গোল করতে না পারলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সয়ে সহজ সুযোগ মিস করেন আরিয়ান রবেন। আর মাত্র ৪ মিনিট বাকি তখন। সকার সিটি স্টেডিয়াম থেকে ইউরোপের ওলি-গলিতে তখন রুদ্ধশ্বাস অবস্থা। মাঝ মাঠ থেকে ব্যাক হিলে বল এগিয়ে দিয়ে ডান সাইড দিয়ে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের দিকে এগিয়ে গেলেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। বাম সাইড থেকে ফার্নান্দো তরেস পাস দিলেন ফ্যাব্রেগাসকে।
ফ্যাব্রেগাসের কৌশলী পাস থেকে ডান পায়ের শটে ডাচ গোল কিপার কে ফাঁকি গিয়ে বল জালে জড়ান আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। তার এই ১ গোলেই প্রথম বারের মত বিশ্বকাপ জিতে স্পেন।

অবাক করার মত একটা ঘটনা ঘটায় স্পেন। বিশ্বকাপের মত এত বড় মঞ্চ পার করতে মাত্র ৩ জন প্লেয়ার গোল করেছে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে এক নাম্বার ফেভারিট হিসেবে স্পেনকে যে তকমা দেয়া হয়েছিল তা যে ফ্লপ ছিল না সেটি বস্কের শিষ্যরা এদিন প্রমাণ করে দিয়েছেন। কেবল ছক বা অঙ্ক নয়, স্কিলের যে দাম আছে সেটি বুঝিয়ে দিলেন জাভিরা। ব্যক্তিগত স্কিল দিয়ে ম্যারাডোনা বিশ্বজয় করেছেন। জাভিরা এ গুণের গুরুত্বটা বুঝিয়ে দিলেন আরেকবার। পুরো টুর্নামেন্টেই দাপটের সঙ্গে খেলেছেন স্প্যানিয়ার্ডরা।

ছবিঃ ইন্টারনেট

CATEGORIES