ফিচারঃ ঐতিহ্য, আক্ষেপ, গৌরব

ফিচারঃ ঐতিহ্য, আক্ষেপ, গৌরব


শার্লক হোমস, প্রতিবেদক

বেলা ১১ টা বেজে ৪ মিনিট , রোজ শনিবার। ভারতীয় বাঁ হাতি স্পিনার মুরালি কার্তিকের ছোড়া বলটি সুইপ করে স্কয়ার লেগে বাউন্ডারি; আর তাতেই পিনপতন নীরবতা ভেঙে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম গর্জে উঠলো বাধভাঙ্গা আনন্দ উল্লাসে। উচ্ছাসে মুখরিত একটি জাতি, একটি দেশ, প্রিয় বাংলাদেশ!

শুধুই কি শিহরিত দেহ আর প্রফুল্ল হৃদয়! এ তো এক অমরত্বগাঁথা ইতিহাস, এক মহা উপন্যাসের উত্থান। দেখিয়ে দেয়ার প্রস্ফুটিত ইচ্ছের নীরব প্রতিবাদ; স্বীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষার এক অপার নিদর্শন। বুঝতে কষ্ট হচ্ছে? তাহলে ভেঙে বলা যাক।

২০০০ সালের ১০ নভেম্বর, রোজ শুক্রবার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে একটি টেস্ট ম্যাচ কেন্দ্র করে মুখোমুখি দুটো দল ; বাংলাদেশ বনাম ভারত। ভারতের জন্য নতুনত্ব না হলেও বাংলাদেশের জন্য গৌরবময় মাহেন্দ্রক্ষণ ; টেস্ট ক্রিকেটে বাংলার পদার্পন।

টস ভাগ্য জয়ে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে। দলের দ্বিতীয় উইকেট পতনে গুটি পায়ে এক ব্যাটসম্যানের ২২ গজে আগমন; নাম আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আগমন সেই দিনের এক যুগ ৭ বছর পরে হলেও, সেদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম দেখেছিলো ধৈর্যের প্রতিমূর্তি এক “বুলবুল”কে।

৭০ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষে ফেরার সময় ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি কিছুটা ভড়কে দেয়ার ইচ্ছেয় বলেছিলো- কাল সকালে নতুন বল নেব। উত্তরে বুলবুল বলেছিলেন, তুমি যা ইচ্ছে করো, আমি সেঞ্চুরি করবো!

বুলবুল মিথ্যে বলেননি, তিনি পেরেছিলেন তার কথা রাখতে। শুধুই কি তাই? প্রবেশ করেছিলেন ক্রিকেট কৃর্তীগাঁথার এক অনন্য উচ্চতায়, স্থান নিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়! দেশের টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরির তৃতীয় সংযোজন ছিলেন বুলবুল। ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব নেয়ার আগে বীরত্ব আর বাধভাঙ্গা ধৈর্য্যের সাথে খেলেছিলেন ৩৮০ বলে ১৭ চারে ১৪৫ রানের অবিস্মরণীয় এক ঐতিহাসিক ইনিংস।

কিন্তু এরপর আর মাত্র খেলেছিলেন ১২ টেস্ট অতঃপর বোর্ডের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তে অভিমান করে নিজেকে গুটিয়ে নেন জাতীয় দল থেকে। তবে ক্যারিয়ারে প্রাপ্তি কম ছিলো না। ১৯৯৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন, ছিলেন ১৯৯৯ বিশ্বকাপে (১ম বিশ্বকাপ) বাংলার কাপ্তান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে খেলেন ইংল্যান্ডের মাইনর কাউন্টি লীগ। কোচ ছিলেন ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনীর।

  সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করেই ক্রিকেট ফেরানো উচিতঃ সৌম্য

এতো গেলো ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রাপ্তি কথা, ক্রিকেটের বাহিরে প্রাপ্তির পরিধি আরও ব্যাপক; আরও গৌরবময়। বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ অধিনায়ক, দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরিয়ান, সাবেক অধিনায়ক, কোচিং পেশা। অতঃপর দেখা দিলেন নতুন পরিচয়ে; ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) গেম ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে।

আপনি দেখেছেন গেইল, সাকিব, আফ্রিদিদের বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট খেলে বেড়াতে। দেখেছেন মুডি, ক্লুজনারদের নানান দেশে বিভিন্ন লীগে কোচিং করাতে। কিন্তু কখনো দেখেছেন ব্যাট ধরা শেখাতে? না দেখেননি, কিন্তু সেই কাজটাই করে যাচ্ছেন বুলবুল।

অজানাকে জানতে, কৌতুহল মেটাতে চাঁদে প্রথম পা ফেলেছিলেন নীল আর্মস্ট্রং। আর চীনে ক্রিকেটের ফেরি করতে, ক্রিকেটকে জানাতে, ক্রিকেট শেখাতে প্রথম পা ফেলেছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এ যেন ক্রিকেটের ইবনে বতুতা!

চীনের মতন ক্রিকেটের ‘অজো পাড়াগাঁয়ে’ ভাষার বাঁধা ডিঙিয়ে, অসাধ্য সাধনে, ক্রিকেট ফেরি করতে পারি দিলেন চীনে। এই রাজ্য থেকে সেই রাজ্য। কত সংগ্রাম, পরিশ্রম! ক্রিকেটের নুন্যতম ধারনা না থাকা জাতিটিকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ক্রিকেট জ্ঞান ছড়িয়েছেন বহু ত্যাগের বদলাতে।

এখানেও অব্যর্থ বুলবুল; সফলও হয়েছেন স্বীয় মিশনে। পেরেছেন চীনে ক্রিকেটের পরিচয় তুলে ধরতে। ফলে, চীন এখন ক্রিকেটকে চেনে; চেনে তাদের ক্রিকেটের জনক বুলবুলকে।

তবে দিনশেষে একটা হতাশা হয়তো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় ; দেশের ক্রিকেটে তার মূল্যায়ন না থাকা। ক্রিকেট ক্যারিয়ারেও যেমন ব্যথাতুর হয়েছিলেন বোর্ড কর্তৃক তেমনি এখনও ভারাক্রান্ত ক্রিকেটের উন্নয়নে তার যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতার ব্যবহারে সুযোগ না পাওয়ায়। অথচ তার সতীর্থদের অনেকেই আজ বোর্ডের উপরের সারির কর্তা!

জাতীয় দল থেকে নিভৃতে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অবসর নেয়া যে আমিনুলে ভর করে বিশ্বের আনাচে-কানাচেতে আজ ক্রিকেট এগিয়ে যাচ্ছে, মরুতে ফুটছে ক্রিকেটের ফুল; সেই বুলবুলকে কাজে লাগাতে আমরা ব্যর্থ!

বুলবুলের অবদান যেমন বাংলাদেশ ক্রিকেটে কভুও ভুলবার নয় তেমনি বুলবুলের প্রয়োজনীয়তা এখনো এদেশের ক্রিকেটে আছে। আছে তার মেধা, যোগ্যতা অভিজ্ঞতার প্রয়োজনীয়তাও। হয়তো কোনো এক ভোর বেলায়, নতুন সূর্যের শুভ্র আলোয় উড়ে যাওয়া পাখিটি তার আগমনী বার্তা দিবে…

  এক যুগ ধরে চেয়েও কোচের চাকরি পাচ্ছেন না রফিক